Print Date & Time : 14 May 2026 Thursday 4:01 am

এবার বন্ধের পথে পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। এর আগে মঙ্গলবার কেন্দ ীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অবসায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেগুলো হলোÑএফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় শতভাগ বা ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের খেলাপি ঋণের হার ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সে ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এর আগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতা, বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি এবং অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের কারণে গত বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল ও অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সরকার ও গভর্নর পরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোয়।
সে সময় অবসায়নের আলোচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমতে, সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের মোট আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।
সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা সাধারণ আমানতকারীদের আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’-এর আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম, দায় পরিশোধে ব্যর্থতা ও মূলধন ঘাটতির মতো কারণের ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিল করা সম্ভব। আর ৭(২) ধারায় লাইসেন্স বাতিলের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
আর্থিক খাতে আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের প্রভাব এখনও বহন করছে খাতটি। পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্সের সঙ্গে এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত ছিল বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়।
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ১৬ শতাংশে। বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য রয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় সাত শতাংশ। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং তাদের মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।