Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 11:09 am

এভিয়েশন শিল্প : বাংলাদেশের নীরব অর্থনৈতিক শক্তি

আলাওল করিম : বাংলাদেশের উন্নয়নের আলোচনা শুরু হলেই আমাদের চোখে ভাসে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা বড় শিল্প-কারখানা। এসব অবকাঠামো দৃশ্যমান, তাই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও এগুলো সহজে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু একটি খাত আছে, যা চোখে কম পড়ে, অথচ অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক সংযোগে যার ভূমিকা গভীর এভিয়েশন শিল্প।

আধুনিক বিশ্বে এভিয়েশন আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক অবকাঠামো। যে দেশ আকাশপথে শক্তিশালী, সে দেশ বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। আর যে দেশ এই খাতকে অবহেলা করে, সে দেশ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল প্রবাহ থেকে পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে এভিয়েশন খাতকে উপেক্ষা করা মানে কেবল একটি শিল্পকে নয় পুরো অর্থনীতির সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে রাখা।

অতীত থেকে বর্তমান: অবহেলা, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার পরিবর্তন

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত ছিল সীমিত ও সংকুচিত। যাত্রী পরিবহন ছিল সীমাবদ্ধ, এয়ার কার্গোর ব্যবহার ছিল নগণ্য, বিমানবন্দর অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি ছিল প্রকট। তখন দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর এবং ধীরে ধীরে শিল্পায়নের পথে। সেই বাস্তবতায় এভিয়েশনকে দেখা হয়েছে একটি ব্যয়বহুল ও গৌণ সেবা হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পড়েছে নীতিনির্ধারণে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এভিয়েশন কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে ধীরগতিতে, নীতিগত সংস্কার হয়েছে সীমিত পরিসরে। ফলে এই খাতটি অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হতে পারেনি।

কিন্তু সময় বদলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর শুধু কৃষিনির্ভর নয়; এটি দ্রুত রপ্তানিনির্ভর ও বৈশ্বিক বাজারমুখী হয়ে উঠছে। তৈরি পোশাক শিল্প বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের অংশ, ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সংযোগ আর বিলাসিতা নয় এটি প্রয়োজন। এই সংযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো এভিয়েশন। একইসঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার, প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াত, বিদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসার চাহিদা সব মিলিয়ে আকাশপথে যাত্রী পরিবহন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে এভিয়েশন এখন আর প্রান্তিক কোনো খাত নয়; এটি সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

শতাংশের হিসাবে অর্থনীতি: বিশ্ব গড় বনাম বাংলাদেশের বাস্তবতা

বিশ্ব অর্থনীতিতে এভিয়েশন শিল্পের অবদান নিয়ে আর কোনো বিতর্ক নেই। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) ও ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে এভিয়েশন শিল্পের মোট অবদান গড়ে ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশ এউচ। এই হিসাবের মধ্যে শুধু এয়ারলাইন্স নয়, বিমানবন্দর, কার্গো, পর্যটন, লজিস্টিকস ও সংশ্লিষ্ট সাপ্লাই চেইনের প্রভাব অন্তর্ভুক্ত। এই গ্লোবাল চিত্রের পাশে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে পিছিয়ে। বিভিন্ন নীতিগত ও বেসরকারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে এভিয়েশন খাতের মোট অর্থনৈতিক অবদান এখনো প্রায় ১ শতাংশ বা তারও কম। অর্থাৎ বিশ্ব গড়ের তুলনায় বাংলাদেশ এই খাতের সম্ভাবনার এক-তৃতীয়াংশও ব্যবহার করতে পারেনি। এই ব্যবধান কোনো স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার ফল নয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কার্যক্রম সবকিছুই এই খাতের সম্প্রসারণের পক্ষে। তবু বাস্তব অবদান কম, কারণ এভিয়েশনকে এখনো কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এই ২৩ শতাংশ ব্যবধানের অর্থ হলো হারানো বিনিয়োগ, সীমিত কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। অর্থনীতির ভাষায় বললে, এটি একটি বড় অপরিচালিত সম্ভাবনা।

এয়ার কার্গো, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: অর্থনীতির গোপন ইঞ্জিন

এভিয়েশন খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এয়ার কার্গোর ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো—এয়ার কার্গো বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভলিউমের দিক থেকে ১ শতাংশেরও কম বহন করলেও, এর মাধ্যমেই পরিবাহিত হয় বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক মূল্যের ৩৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ উচ্চমূল্যের, সময়-সংবেদনশীল ও দ্রুত ডেলিভারিনির্ভর পণ্য মূলত আকাশপথেই চলাচল করে। বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোও ধীরে ধীরে সেই উচ্চমূল্যের দিকে এগোচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পে দ্রুত ডেলিভারির চাপ, ওষুধ শিল্পে আন্তর্জাতিক মান ও সময়ানুবর্তিতা, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য, ই-কমার্স ও বিশেষায়িত সেবার বিস্তার সব ক্ষেত্রেই এয়ার কার্গোর গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। তবু সীমিত কার্গো অবকাঠামো, দক্ষতার ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে এই সম্ভাবনার পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল এখনো পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না।

তবুও বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যেই এভিয়েশন খাত ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA)এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে এভিয়েশন খাত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ আনুমানিক ৮৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করেছে। এটি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.২ শতাংশ। এই অবদান শুধু বিমান চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পর্যটন, সরবরাহ শৃঙ্খল, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাত। আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা একাই বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ স্থানীয় ব্যবসা ও সেবা খাতে ব্যয় করেন, যা সরাসরি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।

এভিয়েশন শিল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। বর্তমানে এই খাতে সরাসরি প্রায় ২৯ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছেন এবং পরোক্ষভাবে ও সহায়ক খাত মিলিয়ে মোট কর্মসংস্থান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজারে। পাইলট, এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো অপারেশন থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, পর্যটন ও লজিস্টিকস এই পেশাগুলো তুলনামূলকভাবে উচ্চ দক্ষতা ও উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি করে। ফলে এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু চাকরি সৃষ্টি নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষ কর্মশক্তি গঠনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করে।

বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে এভিয়েশন একটি শক্তিশালী মাল্টিপ্লায়ার খাত। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, এভিয়েশন খাতে সরাসরি ১ টাকা বিনিয়োগ হলে পরোক্ষভাবে অর্থনীতিতে ৩ থেকে ৪ টাকার সমপরিমাণ কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে এভিয়েশনসংযুক্ত অনেক খাত এখনো পূর্ণ বিকাশ পায়নি, সেখানে এই মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট হিসাব ও খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান উন্নয়ন ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো ও নীতিগত সংস্কার করা গেলে আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যেই এভিয়েশন খাতের অবদান জিডিপিতে ১.৫ শতাংশ বা তারও বেশি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।

ভবিষ্যৎ, ভৌগোলিক সুবিধা ও সিদ্ধান্তের প্রশ্ন

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এভিয়েশন অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্পদ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো হাবে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেয়। বিশ্বে এমন বহু দেশ আছে, যারা তাদের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এভিয়েশনকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এভিয়েশনকে কেবল পরিবহন খাত হিসেবে নয়, একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নীতিগত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ সবকিছুই একসঙ্গে প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনার চিত্র আরও বিস্তৃত। IATA~i পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৮ সালের মধ্যে এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে এবং সৃষ্টি হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান। এই পূর্বাভাস স্পষ্ট করে দেয় এভিয়েশন খাতকে অবহেলা করা মানে শুধু একটি শিল্পকে পিছিয়ে রাখা নয়; এর অর্থ হলো রপ্তানি সক্ষমতা, বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করা। বিশ্ব যেখানে এভিয়েশন থেকে এউচ-এর প্রায় ৪ শতাংশ আদায় করছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনো ১ শতাংশের কাছাকাছি আটকে আছে। এই ব্যবধান সক্ষমতার অভাবে নয়; এটি মূলত সিদ্ধান্তের অভাবের প্রতিফলন।বাংলাদেশ যদি আগামী এক দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়, তবে এভিয়েশন খাতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ আকাশপথকে উপেক্ষা করে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় হয়তো লেখা হবে মাটিতে নয়, আকাশে।

 

শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়