Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 5:56 am

এমএফএস ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ জালিয়াতি

রামিসা রহমান : লন্ডনের আর্থিক খাতে হঠাৎই এক অপ্রত্যাশিত ঝড় বয়ে গেছে। মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস (এমএফএস) নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে চলে এসেছে। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতকোটি পাউন্ডের আর্থিক ঘাটতি ও জালিয়াতির অভিযোগ। বিষয়টি কেবল প্রতিষ্ঠানের পতনের গল্প নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যাংক খাত, বেসরকারি ঋণ বাজার এবং বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদেশি সম্পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই সম্পদের বিপরীতে একাধিকবার ঋণ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এমএফএসের কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে দেখা যাচ্ছে, শ্যাডো ব্যাংকিং এবং স্বল্প-নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।

মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস বা এমএফএস বাংলাদেশের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে সম্পত্তি কেনায় বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান করেছে। বর্তমান সময়ে তার সম্পত্তি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) তদন্তাধীন। প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিপত্রে ব্লুমবার্গের নথি অনুযায়ী, ৯৩০ মিলিয়ন বা ৯৩ কোটি পাউন্ডের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কেবল এমএফএসের আর্থিক কর্মকাণ্ডের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ঋণ বাজারের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরেশ রাজা ২০০৬ সালে এমএফএস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা মূলধারার ব্যাংকের জন্য উপযুক্ত নন বা সমস্যায়  পড়েছেন, তাদের সহায়তার জন্য এখানে আছি। যারা বিদেশে অবস্থান করছেন, অপ্রচলিত সম্পদে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের কথাও আমরা শুনি।’ এমএফএস মূলত ‘জটিল, সম্পত্তিভিত্তিক ঋণ’ প্রদান করে, যার মধ্যে বাই-টু-লেট মর্টগেজ এবং ব্রিজিং লোন ছিল। এগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা বিভিন্ন বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগ করা যায়।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সময়কাল ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত। তিনি যুক্তরাজ্যে সম্পত্তির বড় পোর্টফোলিও তৈরি করেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি এমএফএস-সম্পৃক্ত ঋণদাতাদের কাছ থেকে শত শত সুরক্ষিত ঋণ গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ঋণগুলোর পরিশোধ শুরু হয়।

এনসিএর তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭ কোটি পাউন্ড মূল্যের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। তবে এমএফএস বা রাজার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এখনো দায়ের হয়নি।

আইনজীবীরা জানান, এমএফএসের একটি শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং দল রয়েছে। দলটি প্রতিটি ঋণ যাচাই করে এবং মানি লন্ডারিংবিরোধী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। তারা নিশ্চিত করে যে, এমএফএসের ব্যবসায় বাংলাদেশের সরকারের কোনো প্রভাব নেই।

প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় এমএফএস ভিন্ন কাঠামোর। এটি শ্যাডো ব্যাংক, অর্থাৎ ঋণ প্রদান করে, কিন্তু আমানত গ্রহণ করে না। মূলধারার ব্যাংকের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে না। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি পাউন্ড মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিল। একই সঙ্গে দাবি করেছিল তাদের ঋণের পোর্টফোলিও প্রায় ২৫০ কোটি পাউন্ড। প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে যাওয়ার আগে রাজার কথামতে, ২০২৬ সালে ঋণের পোর্টফোলিও ৩৫০ কোটি পাউন্ডে উন্নীত হবে।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর জন্যও এটি বড় ঝুঁকি। বার্কলেজ, জেফারিজ ও অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের ঋণ প্রায় ১২০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। শেয়ারবাজারে বার্কলেজের শেয়ার ৩ দশমিক  ৮ শতাংশ, জেফারিজের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অ্যাপোলোর ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।

আদালতের বিচারক ব্রিগস বলেন, ‘জালিয়াতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ঋণদাতাদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত সম্পদ সুরক্ষা জরুরি।’ আদালতে রাজার বক্তব্য, ‘মূল ব্যবসার ব্যর্থতা নয়, সাময়িক কারিগরি জটিলতার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।’

বিশ্লেষকরা বড় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। স্যানট্যান্ডার, ওয়েলস ফার্গো, জেফারিজ, বার্কলেজসহ কয়েকটি বড় ব্যাংক এমএফএসের ঋণ জোগান দিয়েছে। বার্কলেজের প্রায় ৬০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। জেফারিজের প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের ৪০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ এবং ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে তদন্ত চলছে।

যুক্তরাজ্যে লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; অভিযোগÑখালার সরকারের কাছ থেকে অবৈধভাবে জমি গ্রহণ। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমএফএস কেসটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, শ্যাডো ব্যাংকিং, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের স্বচ্ছতার এক জটিল কাহিনি হিসেবে দাঁড়াবে। এটি কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমএফএসের ঘটনা প্রমাণ করছে, শ্যাডো ব্যাংকিং এবং বিদেশি সম্পদের বিনিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকলে কীভাবে আর্থিক অনিয়ম বড় আকার ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পদ বিদেশি বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ তত্ত্বাবধানের।

এমএফএস কেসটি শুধু আর্থিক অনিয়মের উদাহরণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এবং শ্যাডো ব্যাংকিং সেক্টরে নীতিনির্ধারকদের জন্যও সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে স্বচ্ছতা, যথাযথ তত্ত্বাবধান এবং নিয়মিত যাচাই কতটা জরুরি।

এ বিষয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিদেশি সম্পত্তি ও ঋণ কার্যক্রম স্বচ্ছ হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বাড়াতে বিনিয়োগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য আইনের যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে শাস্তি দেওয়া উচিত।