Print Date & Time : 16 January 2026 Friday 3:22 am

ওসমান হাদির আদর্শ ও আমাদের প্রত্যয়

কাজী আশফিক রাসেল : ১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই শিবিরে বিভক্ত: শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের হূদয়ের ভাষা। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ঘোষণার সঙ্গে তার পরবর্তী শাসনামলের বাস্তবতার ছিল গভীর বৈপরীত্য। একাত্তরের আগে তার বাগ্মিতা মানুষকে উদ্বেলিত করলেও, স্বাধীনতার পর তার শাসনকাল ক্রমেই পরিণত হয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক একনায়কত্বের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর যিনি শোষিতের পক্ষে অবস্থানের কথা বলেছিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনিই হয়ে ওঠেন শোষণের প্রতীক। একই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় তার কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশকে ঠেলে দেয় এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী বাস্তবতায়। এই উত্তরাধিকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি।

সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ এখনো ‘শোষক ও শোষিত’—এই দুই শিবিরেই বিভক্ত। শোষকের বিরুদ্ধে জনরোষ কতটা প্রবল হতে পারে, তা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সদলবলে ভারতে পালানোর দৃশ্য আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। আর শোষিত মানুষের ভালোবাসা ও আত্মিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি আমরা দেখেছি জুলাইয়ের অন্যতম সৃষ্টি শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়া শরীফ ওসমান হাদি দ্রুতই হয়ে ওঠেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার অবস্থান, ইনসাফ ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং যেকোনো অসংগতির বিরুদ্ধে ঠোঁটকাটা স্বভাব তাকে সাধারণ মানুষের হূদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দেয়। প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে মানুষের আবেগ আরও তীব্র হয়েছে। আজও সারাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা তার জন্য কাঁদে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ তার কবর জিয়ারতে আসে, দোয়া ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই আকাশচুম্বী জনআবেগকেই কাজে লাগিয়ে অন্যায্য রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাচ্ছে কোনো কোনো পক্ষ। ন্যায়বিচারের পথকে বাধাগ্রস্ত করে শহীদ হাদিকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করছে অনেকেই। এটি স্পষ্ট যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী খুনিচক্রের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এজেন্সির সম্পৃক্ততা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, খুনিরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে অবস্থান করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এত গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে খুনিরা কীভাবে নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়ল? দেড় বছর ধরে তথাকথিত সংস্কারের পরও প্রশাসনের অভ্যন্তরে পুরোনো খুনিচক্র কীভাবে বহাল তবিয়তে থাকে? ওসমান হাদির মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রকাশ্য হত্যার পর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই গভীরতর হয়।

হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও চিহ্নিত আওয়ামী সন্ত্রাসী ফয়সাল করিম ওরফে দাউদ খানকে এই ঘটনার আগে ইনকিলাব সেন্টারে হাদির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে—কে বা কারা একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে হাদির এত কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছিল এবং একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে জামিন দিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা কী ভূমিকা রেখেছিলেন, কোন শর্তে তাকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে এনেছিলেন, এ বিষয়ে কি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে?

হাদি হত্যাকে কেন্দ্র করে আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা হলো, একটি চক্র সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে নৃশংস কায়দায় দেশের দুটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম দুটি আদর্শগতভাবে বিরোধী কিংবা কারও দৃষ্টিতে শত্রু ভাবাপন্ন হলেও এমন বর্বরোচিত হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া শহীদ হাদির আদর্শ ছিল, শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ। ভিন্ন আদর্শ বা ভিন্ন অবস্থান আগুন দিয়ে দমন করা নয়, বরং যুক্তি ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েই তা মোকাবিলা করা। যারা সেদিন আগুন দিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই হাদির আদর্শকে অবমাননা করেছে এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা প্রয়োজন।

হাদি হত্যার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, এখানে আওয়ামী খুনিচক্রের পাশাপাশি একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু সেই গোষ্ঠীর নাম উচ্চারণে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত অস্বস্তি ভোগ করছে। এমন নীরবতা জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।

আমরা দেখেছি, গত ১৫ ডিসেম্বর হাদি হত্যার বিচার দাবি করে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। কিন্তু অদৃশ্য কোনো কারণে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। কেন তিনি নিজের অক্ষমতার কথা জাতির সামনে পরিষ্কার করলেন না?

একইভাবে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী ৩ জানুয়ারির মহাসমাবেশ আহ্বান করেও তা স্থগিত করে দেয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও ৯ জানুয়ারির জাতীয় মহাসমাবেশ বাতিল করেছে। প্রশ্ন ওঠে, কোন অদৃশ্য শক্তির ভয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করে পরে পিছু হটতে হলো? হাদির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে বিএনপির সহমমরতা চোখে পড়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়; কিন্তু হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে দৃঢ় অবস্থান নিতে না পারাটা বেদনাদায়ক।

এমনকি হাদির জানাজায় উপস্থিত হয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তাকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে শ্রদ্ধা জানালেও, বিচারের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট আশ্বাস দেননি, যা হতাশা আরও বাড়িয়েছে।

তাহলে কি বাংলাদেশ হাদি হত্যার বিচার দেখবে না? অদৃশ্য শক্তির চোখ রাঙানিতে কি দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোও নীরব থাকবে? ওসমান হাদি বারবার বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করা হলে শুধু বিচারটা করেন।’ এই দাবিকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের সব বিপ্লবী চেতনাকে রুদ্ধ করা।

আমরা চাই, হাদি হত্যার বিচার দিয়েই শুরু হোক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নময় পথচলা। কারণ হাদিদের চির উন্নত শিরই হতে পারে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের শক্তি ও প্রেরণা।

তরুণ লেখক