নিজস্ব প্রতিবেদক : এলপিজি নিয়ে গ্রাহক ভোগান্তি কমছেই না। সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফলাফল একই। ভোগান্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কোম্পানির পক্ষ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার নেওয়া হচ্ছে না। ফলে দোকানের গোডাউনে জমছে সিলিন্ডারের সংখ্যা। এতে বাধ্য হয়ে অন্য কোম্পানির গ্যাস নিতে হচ্ছে। আর এর পেছনে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা; যা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকছে। অনেক সময় আরও বেশি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অনেক সময় টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। এতে গ্রাহকরা বিকল্প দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই ঝুঁকছেন ইলেকট্রিক চুলার দিকে। আসন্ন রমজানে এলপিজি নিয়ে এই ভোগান্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
খুচরা দোকানিরা বলছেন, গ্যাস সংকট নিয়ে কথা না বলতে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আমাদের ওপরে চাপ রয়েছে। ফলে এ নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। ক্ষেত্রবিশেষে গ্যাস সরবরাহ না করার কথাও বলা হচ্ছে।
রাজধানীতে কয়েকজন খুচরা এলপিজি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তারা সবাই বলছেন, সংকট যে রয়েছে তা সরকার এবং কোম্পানিগুলো স্বীকার করছে না। বিক্রেতাদের প্রশ্ন, এত এলপিজি মজুত থাকলে তারা দিতে পারছে না কেন। রাজধানীর রামপুরা, খিলগাঁও এবং কাঠালবাগানসহ বেশকিছু এলাকায় ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, তাদের দোকানে এবং গোডাউনে বিভিন্ন কোম্পানির খালি সিলিন্ডার জমা হচ্ছে। ফেরত দিতে চাইলে কোম্পানিগুলো এসব সিলিন্ডার ফেরত নিচ্ছে না। কোম্পানির তরফ থেকে বলা হচ্ছে, ‘এলপিজি কেনা হচ্ছে। জাহাজ এলেই রিফিলের জন্য সিলিন্ডার নেওয়া হবে।’
রামপুরা এলাকার ব্যবসায়ী মোতালেব ভুঁইয়া জানান, যে কোম্পানির কাছ থেকে তারা গ্যাস কেনেন, তাদেরকেই খালি সিলিন্ডার ফেরত দিতে হয়। অন্য কোম্পানির খালি সিলিন্ডার তারা নেন না। অর্থাৎ গ্রাহক যদি একবার এক কোম্পানির সিলিন্ডার কেনেন, তাকে আবার কিনতে হলে সেই কোম্পানির গ্যাসই নিতে হয়। তিনি অন্য কোনো কোম্পানির গ্যাস নিতে চাইলে বাড়তি অর্থ গুনতে হয়। বর্তমানে বাজারে অনেক কোম্পানির সিলিন্ডার রয়েছে। কিন্তু কেউই সেগুলো রিফিল করছে না। এতেও গ্যাসের দাম বেশি পড়ছে।
খিলগাঁওয়ের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা তোরাব মোল্লা বলেন, আমি যে কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতাম, সেই কোম্পানি এলপিজি রিফিল করছে না। আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। তিনি জানান, ডিস্টিবিউটররা বলছেন, তারা কোনো খালি বোতল ফেরত নেবে না। কেবল যে কোম্পানির গ্যাস আছে, সিলিন্ডারসহ সেটা কিনতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে একটি খালি বোতল ৮০০ টাকা দিয়ে কিনলেও এখন ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তিনি জানান, সরবরাহকারীরা বলেছেন, খুব শিগগিরই নাকি সংকট কেটে যাবে। কয়েকটি কোম্পানি নাকি এলপিজির আমদানি বাড়িয়েছে।
এদিকে রমজানের আগেই সংকট কাটাতে দুই মাসের আমদানির লক্ষ্যমাত্রার কথা জ্বালানি উপদেষ্টা ফওজুল কবির খানকে জানিয়েছে এলপিজি অপারেটর কোম্পানিগুলো। বুধবার বিকালে চলমান সংকট নিরসনে জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন অপারেটররা। সেখানে তারা দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির কথা জানান।
বৈঠকে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছেন, ‘জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অপারেটররা যে এলপিজি আমদানির কমিটমেন্ট দিয়েছেন, তা যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। এই লক্ষ্যে সরকারও সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানির পরিমাণ বাড়াতে সরকারিভাবে বিপিসিকে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। উপদেষ্টা বলেন, ‘এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বিপিসিকে। ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরুর জন্য বিপিসির চেয়ারম্যানকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হচ্ছে।’
এত কিছুর পরেও এখনও পর্যন্ত কোনো সুফল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। গতকাল কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে জানা যায়, তারা ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকায় কিনেছেন। বনশ্রীর বাসিন্দা এক বাসিন্দা জানান, সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যায়। সারা এলাকা ঘুরেও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছিল না। দুপুরে রান্না তো করতে হবে। পরে রামপুরা বাজারে গিয়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনলাম। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালাম সরকার বলেন, তিনিও আজই ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল কালাম আজাদ জানান, এলপিজি গ্যাস নিয়ে তিনি অনেকটাই বিরক্ত। সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। বিকল্প হিসেবে এরইমধ্যে ইলেকট্রিক চুলা কিনেছেন বলে জানান তিনি। তার মতে, তুলনামূলক ইলেকট্রিক চুলায় খরচ অনেক কম। তাছাড়া আসন্ন রমজানে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
উল্লেখ্য, দেশে বছরে এলপিজির মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। সরকারি এলপিজি কোম্পানি ‘এলপি গ্যাস লিমিটেডের’ দুটি প্রধান প্লান্ট রয়েছে চট্টগ্রাম ও সিলেটের কৈলাশটিলায়। এই দুই প্লান্ট মিলিয়ে বছরে মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। বাকি চাহিদার বেশির ভাগ বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে থাকে। ফলে এলপিজির বাজার পুরোটাই এখন বেসরকারি খাতের হাতে জিম্মিÑএমন অভিযোগ গ্রাহকদের।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post