Print Date & Time : 24 April 2026 Friday 5:47 am

করতোয়ার বুকজুড়ে দূষণের প্রতিযোগিতা অস্তিত্ব সংকটে জলজ প্রাণী

মাহবুবা পারভীন: বগুড়ার করতোয়া নদী এখন যেন দূষণের এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়ি, বাজারঘাট ও সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে পৌরসভার বর্জ্যÑসবকিছুই নির্বিচারে ফেলা হচ্ছে নদীতে। এমনকি শৌচাগারের ড্রেন ও নালার সংযোগও সরাসরি নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেডিকেলের বিষাক্ত বর্জ্য। ফলে করতোয়ার পানির মান এতটাই খারাপ হয়েছে যে, বর্ষার তিন মাস বাদে বছরের বাকি সময়ে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
শহরের ফতেহ আলী বাজার ও রাজা বাজার এলাকাতেই দূষণের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমা হলেও সেগুলো ফেলার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকেই সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছেন। বিশেষ করে গরু-ছাগল জবাইয়ের পর অবশিষ্টাংশ নদীতে ফেলার কারণে দূষণ আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
রাজাবাজার আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, ‘বগুড়া বড় শহর হওয়ায় প্রতিদিন প্রচুর বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু সেগুলো ফেলার জন্য পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। বাধ্য হয়েই অনেকে নদীতে ফেলছে।’
করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বগুড়া জেলা কারাগার থেকেও বর্জ্য সরাসরি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জেল সুপার বলেন, ‘এটা শুধু কারাগারের সমস্যা নয়, পুরো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায়
এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
এদিকে করতোয়া নদী দখল ও দূষণের অভিযোগে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএসের নাম বারবার উঠে আসছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ফেলে ভরাট এবং কারখানার বর্জ্য ফেলার মাধ্যমে নদী দূষণে ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন ছোটখাটো দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও বড় দখলদারদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।’
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পরিদর্শনে করতোয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে দখল ও দূষণের চিত্র উঠে আসে। কমিশন জেলা প্রশাসককে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে টিএমএসএসের বিরুদ্ধে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে নদীতে ময়লা ফেলা বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন রোধ এবং কৃত্রিম বাঁধ বা আইল্যান্ড অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে টিএমএসএস। তাদের দাবি, তারা ১৯৯৫ সালে সরকারের কাছ থেকে ৯৯ বছরের জন্য ৪ দশমিক ৯ একর জমি ইজারা নিয়েছে এবং নদী দখলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
করতোয়া দূষণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা। তিনি বলেন, ‘দূষণ রোধে বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তবে ডাস্টবিন স্থাপন করলে সেগুলো চুরি হয়ে যায়। ৩০০ কোটি টাকার একটি পানি শোধনাগার প্রকল্প ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি নদী দখল ও দূষণ রোধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।
আইন অনুযায়ী, নদী দখল বা দূষণের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ২০২০ সালের খসড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। গুরুতর ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে হাইকোর্ট করতোয়া নদীতে সব ধরনের বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা দেয়। তবুও বাস্তবে সেই নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স অবস্থানে আছি। কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আইনি নির্দেশনা থাকার পরও কেন থামছে না করতোয়ার দূষণ? এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় এই নদী শুধুই ইতিহাস হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।