Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 3:23 am

কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ও চ্যাটজিপিটির নতুন সংস্করণ

তানজিম হোসেন: একসময় মানুষ আগুন আবিষ্কার করে সভ্যতার ভিত গড়েছিল, শিল্পবিপ্লব এনে দিয়েছিল যন্ত্রের যুগ, আর আজ পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে আরেক নতুন বিপ্লবের দোরগোড়ায়Ñকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব। এই বিপ্লবের শব্দ শোনা যায় না কারখানার ধোঁয়ায়, রেলগাড়ির চাকার ঘর্ষণে কিংবা মুদ্রণযন্ত্রের ধাতব আওয়াজে। এটি নীরবে প্রবেশ করছে মানুষের ডেস্কে, অফিসের মিটিংরুমে, শিক্ষার্থীর খাতায়, এমনকি শিল্পীর কল্পনাতেও। এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আর কেবল প্রযুক্তির শব্দ নয় এটি হয়ে উঠেছে সময়ের নতুন অভিধান।
বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রগুলোতে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যে কাজগুলো একসময় মানুষের দীর্ঘ পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করত সেসব কাজের অনেকটাই আজ কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন করে ফেলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। রিপোর্ট লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাফিক ডিজাইন, কোডিং, কনটেন্ট তৈরি, এমনকি আইনি খসড়া প্রস্তুত করার মতো কাজেও এআই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেÑএর মতো জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি।
২০২৫ সালে চবি জবংবধৎপয ঈবহঃবৎ-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় ৫২ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এআই নতুন চাকরির সুযোগ বাড়াবে। বিপরীতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আশঙ্কা করেন যে এটি তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেবে ।
এই উদ্বেগ অমূলক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বহু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে এআই-ভিত্তিক ‘দক্ষতা বৃদ্ধি’কে কারণ হিসেবে দাড় করিয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিগুলো এখন এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে যেখানে কমসংখ্যক মানুষ দিয়েই অধিক উৎপাদন সম্ভব হবে।
তবে গল্পের আরেকটি দিকও আছে। এআই কেবল চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না বরং নতুন দক্ষতারও জš§ দিচ্ছে। একসময় যেমন কম্পিউটার শেখা ছিল বিশেষ দক্ষতা। আজ এআই ব্যবহার করতে জানা হয়ে উঠছে নতুন যুগের সাক্ষরতা। ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮৭ শতাংশ কর্মী নিয়মিত এআই ব্যবহার করছেন এবং অর্ধেকেরও বেশি কর্মী প্রতিদিন এআই টুল ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে ৫২ শতাংশ কর্মী ভয় পাচ্ছেন যে এই প্রযুক্তিই হয়তো একদিন তাদের বিকল্প হয়ে উঠবে।
এ যেন মানুষের নিজের তৈরি আয়নার প্রতিচ্ছবিকে ভয় পাওয়ার মতো এক পরিস্থিতি। মানুষ নিজ হাতে এমন এক বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে যা তাকে সাহায্যও করছে আবার একই সঙ্গে তাকে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার শঙ্কাতেও ফেলছে।
চ্যাটজিপিটির নতুন সংস্করণগুলো ঘিরে এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। নতুন সংস্করণগুলো এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেয় না বরং ছবি বোঝে, কণ্ঠ শুনে প্রতিক্রিয়া জানায়, দীর্ঘ বিশ্লেষণ করতে পারে, প্রোগ্রাম লিখতে পারে এমনকি মানুষের আবেগের ভাষাও কিছুটা ধরতে পারে। প্রযুক্তি জগতের জন্য এটি বিস্ময়কর এক অগ্রগতি। অনেকেই বলছেন, এটি ভবিষ্যতের ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।
তবে এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেও এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। কারণ মানুষ বুঝতে শুরু করেছে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে মানুষের প্রচলিত দক্ষতাগুলো তত দ্রুত পুরোনো হয়ে পড়ছে। চঈি-এর বৈশ্বিক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৫৪ শতাংশ কর্মী ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করেছেন। একই জরিপে দেখা যায়, অনেক কর্মী এআই নিয়ে আশাবাদী হলেও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা দিন দিন বাড়ছে।
অন্যদিকে এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন এআই ব্যবহার করেন তারা নিজেদের উৎপাদনশীলতা ও কাজের সন্তুষ্টি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি অনুভব করেন।
এখানেই এআই বিপ্লবের দ্বৈত রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি যেমন ভয় সৃষ্টি করছে তেমনি সম্ভাবনার নতুন দরজাও খুলে দিচ্ছে। ইতিহাসের প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ই এমন হয়েছে। শিল্পবিপ্লবের সময় মানুষ ভয় পেয়েছিল যন্ত্রকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই যন্ত্রই নতুন অর্থনীতি সৃষ্টি করেছিল। সম্ভবত এআইও তেমনই কিছু পেশাকে হয়তো বিলীন করবে আবার কিছু সম্পূর্ণ নতুন পেশার জš§ দেবে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি প্রযুক্তি নয় বরং মানবিকতা নিয়ে। যদি একদিন মেশিন মানুষের মতো লিখতে পারে, কথা বলতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাহলে মানুষের স্বাতন্ত্র্য কোথায় থাকবে? সৃজনশীলতা, অনুভূতি, সহমর্মিতা এসব কি এখনও মানুষের একান্ত সম্পদ হয়ে থাকবে নাকি সেগুলোরও কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও সময়ের হাতে বন্দি। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত যে এআই আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি ইতোমধ্যেই আমাদের বাস্তবতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে করপোরেট কর্মী, সাংবাদিক থেকে শিল্পী সবাই এখন এক নতুন যুগের সীমানায় দাঁড়িয়ে।
সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষ আর মেশিনের সম্পর্ক হবে প্রতিযোগিতার নয় সহাবস্থানের। যে মানুষ প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখবে সেই মানুষই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি কখনও পুরোপুরি মানুষের বিকল্প হয় না, বরং মানুষকেই নতুনভাবে গড়ে তোলে।
এআই বিপ্লব তাই কেবল প্রযুক্তির গল্প নয় এটি মানুষের অভিযোজনের গল্প।ভয়ের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প আর ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে কল্পনা করার গল্প। পৃথিবী হয়তো বদলাচ্ছে কিন্তু সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এখনও মানুষই রয়েছেব তার স্বপ্ন, তার সৃজনশীলতা এবং তার অদম্য কৌতূহল নিয়ে।

শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়