Print Date & Time : 16 May 2026 Saturday 1:30 am

কর্মক্ষেত্রে নারী চুপ থাকে, কারণ কথা বললে চাকরি থাকবে না

নিলুফা আক্তার: সকাল আটটায় অফিসে ঢুকতেই মাহিয়ার বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। না, কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং নেই, কোনো ডেডলাইনের চাপ নেই। চাপটা অন্য জায়গায়। বিভাগীয় প্রধান আজ কী মেজাজে আছেন, সেটাই তার দুশ্চিন্তার কারণ। গতকাল তিনি ফাইল দিতে গেলে হাত ধরে টেনেছিলেন, বলেছিলেন ‘এত তাড়াতাড়ি কোথায় যাও?’ মাহিয়া হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এসেছিল। আজ সারাদিন সেই মানুষটার সামনে কীভাবে কাজ করবে, ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
মাহিয়া একা নন। বাংলাদেশের হাজার হাজার কর্মজীবী নারী প্রতিদিন এই নীরব যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি সব খাতেই এই চিত্র প্রায় একই রকম। কিন্তু কেউ কথা বলেন না, কারণ কথা বলার মূল্য তাদের চাকরি, সম্মান, এমনকি পরিবারের শান্তি পর্যন্ত।
ফারজানা একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেন। দুই বছর আগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি লক্ষ্য করছেন একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন। শাখা ব্যবস্থাপক প্রায়ই অফিস আওয়ারের পরে তাকে একা ডেকে পাঠান, বলেন ‘কিছু জরুরি কাজ আছে।’ ফারজানা বুঝতে পারেন এই ‘জরুরি কাজ’ আসলে কী। প্রথম দিকে তিনি এড়িয়ে যেতেন, অজুহাত দিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলেন তার পারফরম্যান্স রিপোর্টে ‘টিমওয়ার্কে দুর্বল’ লেখা শুরু হয়েছে। ইনক্রিমেন্ট আটকে গেছে। প্রমোশনের তালিকা থেকে নাম বাদ।
ফারজানা জানেন কেন এমন হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? কাকে বলবেন? এইচআর-এ অভিযোগ করলে প্রথম প্রশ্ন আসবে ‘আপনি কি নিশ্চিত?’ দ্বিতীয় প্রশ্ন ‘কোনো সাক্ষী আছে?’ তৃতীয় প্রশ্নটা সরাসরি না হলেও ভেতরে ভেতরে থাকবে ‘আপনি কি নিজে কিছু করেছিলেন?’ এভাবেই শিকার হয়ে যায় অপরাধী।
রুমানা একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন। তার কাজের চাপ পুরুষ সহকর্মীদের সমান, কখনো কখনো বেশি। কিন্তু যখন বড় প্রজেক্টের জন্য দল গঠন করা হয়, রুমানার নাম বাদ পড়ে যায়। কারণ জিজ্ঞেস করলে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হেসে বলেন, ‘ওই প্রজেক্টে রাত জাগতে হবে। মেয়েদের পক্ষে সম্ভব না।’
রুমানা বলতে চান, তিনি রাত জাগতে পারেন, তার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেই সুযোগটুকু দেওয়া হয় না। ধরেই নেওয়া হয় নারীরা ‘দুর্বল’, ‘পারিবারিক দায়িত্ব’ তাদের প্রথম অগ্রাধিকার, তারা ‘ঝুঁকি’ নিতে পারেন না। এই পূর্বধারণা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, রুমানার সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে পারেন না।
বছর শেষে দেখা যায়, পুরুষ সহকর্মীরা বড় প্রজেক্ট করে প্রমোশন পেয়ে যান। রুমানা একই পদে থেকে যান, কারণ তার ‘অভিজ্ঞতা কম।’ অথচ সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগই তো তাকে দেওয়া হয়নি।
নাজমা একটি সরকারি দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তিনি জানেন, অফিসের লিফটে একা ওঠা মানে ঝুঁকি। জানেন ক্যান্টিনে বসলে পেছন থেকে কে কী মন্তব্য করছে। জানেন মিটিংয়ে কথা বললে ‘খুব স্মার্ট হতে চায়’ বলে কানাকানি হবে। আর যদি চুপ থাকেন, তাহলে ‘মেয়েরা তো কিছু পারে না’Ñ এই তকমা জুটবে।
গত মাসে একটি মিটিংয়ে নাজমা একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ঠিক পরের সপ্তাহে একজন জুনিয়র পুরুষ কর্মকর্তা প্রায় একই প্রস্তাব দিলেন, ভাষা একটু বদলে। সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নাজমা চুপ করে বসে রইলেন। ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলেন, কিন্তু মুখে কিছু বলার উপায় নেই। বললেই ‘ঈর্ষা’, ‘পেটি’, ‘ইমোশনাল’Ñএই বিশেষণগুলো জুটে যাবে।
সামিরা গত বছর মা হয়েছেন। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে অফিসে ফিরে দেখলেন তার প্রজেক্টগুলো অন্যকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে বলা হলোÑ‘তুমি এখন বাচ্চা সামলাও, হালকা কাজ করো।’ সামিরা বোঝালেন তিনি আগের মতোই কাজ করতে পারবেন, কিন্তু কেউ শুনল না।
ছয় মাস পর যখন প্রমোশন লিস্ট বের হলো, সামিরার নাম নেই। কারণ জানতে চাইলে বলা হলো ‘তোমার ফোকাস তো এখন বাচ্চার দিকে, প্রমোশন নিলে চাপ বাড়বে।’ সামিরা ভাবলেন, এই সিদ্ধান্ত কে নিল? তিনি নিজে তো বলেননি চাপ নিতে পারবেন না। অথচ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হলোÑ‘তোমার ভালোর জন্যই।’
এভাবেই মাতৃত্ব হয়ে যায় ক্যারিয়ারের অন্তরায়। যেন সন্তান জš§ দেওয়া মানে পেশাগত সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
এই গল্পগুলো কাল্পনিক নয়। প্রতিটি মাহিয়া, ফারজানা, রুমানা, নাজমা, সামিরা আমাদের চারপাশেই আছেন। হয়তো আপনার পাশের ডেস্কে, হয়তো আপনার বোন, হয়তো আপনার স্ত্রী। তারা প্রতিদিন এই অদৃশ্য নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছেন এবং চুপ থাকছেন কারণ ব্যবস্থা তাদের কথা শোনার জন্য তৈরি নয়।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে, আইন আছে, নীতিমালা আছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো কাগজে-কলমে রয়ে গেছে। অভিযোগ কমিটি গঠন করা হয় দায়সারাভাবে, তদন্ত হয় লোক দেখানো, শাস্তি হয় না কখনোই। উল্টো অভিযোগকারী নারীকেই বদলি করে দেওয়া হয়, ‘তার মানসিক শান্তির জন্য।’
প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে দরকার মানসিকতার বদল। দরকার এমন একটি কর্মপরিবেশ যেখানে নারীরা ‘না’ বলতে পারবেন ভয় ছাড়া, অভিযোগ করতে পারবেন লজ্জা ছাড়া, এবং কাজ করতে পারবেন বৈষম্য ছাড়া। যতদিন না সেই পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, ততদিন মাহিয়ারা অফিসে ঢুকতেই ভয় পাবেন, ফারজানারা চুপ করে সহ্য করবেন, রুমানারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়বেন।
এই নীরবতা ভাঙার দায়িত্ব শুধু নারীদের নয়Ñপুরুষ সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক সবার। কারণ একটি ন্যায্য কর্মক্ষেত্র শুধু নারীদের জন্য নয়, সবার জন্যই প্রয়োজন।