Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 9:32 am

কর্মসংস্থান ইস্যুতে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায় জনগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে মানুষের প্রধান উদ্বেগের তালিকায় শীর্ষেই রয়েছে কর্মসংস্থান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এখন স্পষ্ট, বাস্তবায়নযোগ্য এবং কার্যকর কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রত্যাশা করছে জনগণ।

গতকাল সোমবার ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) যৌথভাবে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নভেম্বর-২০২৫ এ পরিচালিত জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তারা এক বছর আগের তুলনায় ভালো অবস্থায় নেই। এর প্রধান কারণ হিসাবে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যাওয়া আয় ও সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন, আর ১৭ শতাংশ দায়ী করেছেন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে।

জরিপে আরও দেখা যায়, ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে না, আর ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।

সংলাপের সূচনা বক্তব্যে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কর্মসংস্থান বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। তিনি বলেন, তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো নিশ্চিত নয় যে রাজনৈতিক দলগুলো  তাদের কর্মসংস্থানের চাহিদাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই সংলাপে নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য নীতিগত সমাধান নিয়ে তারা বক্তব্য দেন।

বেসরকারি খাতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বিডিজবস-এর প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন, কারণ পার্শ্ববর্তী কিছু দেশে বেকারত্বের হার বাংলাদেশের চেয়েও বেশি।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশে শিক্ষিত বেকারত্ব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, ২০১০ সালে যেখানে হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। বিপরীতে অশিক্ষিত বেকারত্ব কমেছে।

আকিজ-বশির গ্রুপের গ্রুপ এইচআর ডিরেক্টর দিলরুবা এস খান বলেন, শ্রমবাজারে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে শিল্পকারখানাগুলো দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলছে, অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীরা কাজ পাচ্ছেন না। তিনি এই ব্যবধানের জন্য দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে শিল্পের চাহিদার দুর্বল সমন্বয়কে দায়ী করেন। স্কুল পর্যায় থেকেই দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পাঠ্যক্রম সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ) এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মারিনা সুলতানা বলেন, প্রতিবছর ১১ থেকে ১২ লাখ তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। তবে দক্ষতার ঘাটতি ও কাজ না পাওয়ায় গতবছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। এটি রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে। তিনি বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন।

শিল্প খাতের উদ্বেগ তুলে ধরে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংকিং ও শিল্পনীতির জটিলতায় ধীরে ধীরে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত ৩৮ বছরে আমরা যত সংকট দেখিনি, গত দুই বছরে তার চেয়েও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি।’ কর্মসংস্থান রক্ষায় শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক দলের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির পলিসি টিম সদস্য সাইয়েদ আবদুল্লাহ বলেন, ভবিষ্যতের সব বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কেন্দ্রে থাকবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তিনি জানান, দলটি দক্ষতা উন্নয়ন, আইটি খাত সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ভাষাশিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে।

তিনি আরও জানান, তাদের দল যখন নীতিমালা প্রণয়ন এবং পর্যালোচনা করে তখন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. হাফিজুর রহমান বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি ব্যাপক পরিসরে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উপজেলা পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, যুব ঋণ কর্মসূচি এবং কর সংস্কারের প্রস্তাব দেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, চাকরির নিরাপত্তা এবং কৃষি ও আইটি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি।

গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যাদের অনেকেই এখনো নতুন কাজ পাননি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নির্বাচনের পর নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

করিগর এর ম্যানেজিং পার্টনার তানিয়া ওয়াহাব বলেন, অনেক কারখানাই শ্রমিক ধরে রাখতে পারছে না। উদ্যোক্তাদের হয়রানি, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি পর্যটন এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

সংলাপটি পরিচালনা করেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব পার্টি আমিনুল এহসান।

সংলাপটি ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাস্তবায়িত বি-স্পেস প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত হয়, যেখানে অর্থায়ন করেছে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং জাতিসংঘের ইলেক্টোরাল প্রজেক্ট ব্যালট ও ড্রিপ।