নিজস্ব প্রতিবেদক : নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের জুনিয়র পর্যায়ের শত শত কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হওয়া এবং পরে চাকরি ফেরতের দাবিতে আন্দোলনের ঘটনা আলোচনায় থাকলেও, একই সময়ে ব্যাংকের এক শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর নিয়োগ ও পদোন্নতি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের নিজস্ব নিরীক্ষা বিভাগ পরিচালিত অডিটে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিরীক্ষা সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা সাবেক দুই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিগত সচিব হওয়ায় তাকে প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় না এনে একাধিকবার দপ্তর বদলির মাধ্যমে আড়াল করা হয়েছে। প্রথমে চেয়ারম্যান সেক্রেটারিয়েট থেকে রিটেইল ডিভিশনে, পরে গত বছরের ৬ অক্টোবর তাকে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে বদলি করা হয়। ব্যাংকের ভেতরে সমালোচনা জোরালো হলে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর তাকে ঢাকার উত্তরা মডেল টাউন শাখায় বদলি করা হয়।
ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম কাজী শাহেদ জামিল (আইডি নং-০০৭৫৫০)। তিনি বর্তমানে উত্তরা মডেল টাউন শাখায় সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে কর্মরত।
চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০২১ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের মালিকানাধীন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংকে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বাছাই ও তদারকির দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সচিব কাজী শাহেদ জামিল।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো ধরনের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের ১২ আগস্ট তাকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯ আগস্ট তিনি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে যোগদান করেন এবং একই দিন চেয়ারম্যানের সচিবালয়ে ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে বদলি হন।
তবে ব্যাংকের এমপ্লয়িজ সার্ভিস রুলস ১৯৯৫ অনুযায়ী, এসইও পদে নিয়োগ পেতে কমপক্ষে তিন বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকতে হয় এবং বয়সসীমা ৩৩ বছরের মধ্যে হতে হয়। অথচ নিয়োগের সময় কাজী শাহেদ জামিলের বয়স ছিল ৩৮ বছরের বেশি এবং তার কোনো ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাই ছিল না। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ নিয়োগকে সার্ভিস রুলসের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকে যোগদানের মাত্র এক বছর আট মাস ২৮ দিনের মাথায় ২০২৩ সালে কাজী শাহেদ জামিলকে এক লাফে চারটি গ্রেড অতিক্রম করে এসইও থেকে সরাসরি সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে একসঙ্গে পাঁচ ধাপ পদোন্নতি কার্যকর হয়, যা ব্যাংকিং খাতে বিরল ও নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১৭ মে তিনি ব্যাংকের চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং একই দিন তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। যদিও সার্ভিস রুলস অনুযায়ী তিন মাসের নোটিশ বা সমপরিমাণ বেতন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; সে অর্থ তিনি পরিশোধ করেননি এবং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ছাড়ও নেননি।
উল্টো ওই দিনই নতুন ইআইডি নম্বর দিয়ে তাকে সাতটি ইনক্রিমেন্টসহ এসএভিপি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ পুনর্নিয়োগ ও ইনক্রিমেন্ট প্রদানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা ব্যাংকের সার্ভিস রুলসের পরিপন্থি।
এ বিষয়ে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জালাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে তদন্তাধীন রয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post