Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 3:23 pm

কিস্তি পেছানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি আইএমএফ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরবর্তী ঋণ কিস্তি ছাড় না হওয়ার খবর ঘিরে অর্থনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি আইএমএফ। বিষয়টি নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অশোক দত্ত

শেয়ার বিজ: আইএমএফের বর্ধিত ঋণ সুবিধার প্রথম ৫টি কিস্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। ষষ্ঠ কিস্তি আটকে গেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়েছেÑবিষয়টি কতটা সত্য জানতে চাই।

ড. জাহিদ হোসেন: গভর্নরকে কোট করে ওয়াশিংটনে যে আলোচনা হয়েছে, সেখান থেকে এখন পর্যন্ত আমরা আইএমএফের থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাইনি। আইএমএফ সরাসরি কোনো ঘোষণা দেয়নি, কোনো চিঠিও পাঠায়নি। এমনকি অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও কোনো চিঠি আদান-প্রদান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মনে হয় না। মূল বিষয় হলো, প্রোগ্রামটা অন ট্র্যাকে আছে কি না?

জুন মাসে আইএমএফ এসে মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় প্রোগ্রামের আকার বাড়ানোর। তারা তখনই ৮০০ মিলিয়ন ডলার যোগ করেছে এবং মেয়াদও বাড়িয়েছে। আগে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জুনে। এখন আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এখন যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে এসব কিছু জেনেই তো তারা এত কিছু করেছে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এখন অক্টোবরে হঠাৎ কী এমন ঘটল যে তারা পুনর্মূল্যায়ন পেছাচ্ছে?

শেয়ার বিজ: তাহলে কি নির্বাচনই এ বিলম্বের কারণ?

ড. জাহিদ হোসেন: দেখুন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবেÑএটা নতুন কিছু নয়। জুন মাসেই তো ওরা জানত! তাহলে তখন কেন বলেনি, নতুন সরকার এলে তবেই পরবর্তী কিস্তি ছাড়ব। এখন অক্টোবর এসে যদি বলে, নির্বাচন আছে, একটু দেখি, তাহলে প্রশ্ন উঠবেইÑকী বদলে গেল?

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা জল্পনা করার কিছু নেই, তবে আইএমএফের মুখ থেকে একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আমদের পাওয়া উচিত। গভর্নর বলেছেন, টাকা না এলে সমস্যা নেইÑরিজার্ভ এখন তুলনামূলক ভালো। কিন্তু  নীতি সহায়তা বজায় থাকা জরুরি। আমি এটার সঙ্গে একমত।

সংস্কার থেমে গেলে সেটাই বড় ক্ষতি। কারণ সংস্কারই হচ্ছে আসল লক্ষ্য, টাকা নয়। আইএমএফের প্রোগ্রাম যদি অনট্র্যাক থাকে, তাহলে কিস্তি আটকে থাকার কারণও যৌতিকভাবে থাকা উচিত। নির্বাচন কোনো অজুহাত হতে পারে না।

শেয়ার বিজ: সংস্কার প্রক্রিয়া কি অন ট্র্যাকে আছে?

ড. জাহিদ হোসেন: এ প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের কর্মসূচিতে ইউপিসি, আইপি, স্ট্রাকচারাল বেঞ্চমার্কÑএসব শর্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করতে হয়। যেমন রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা ইত্যাদি।

এগুলো কি সময়মতো হচ্ছে?

রাজস্বের ক্ষেত্রে (রেভিনিউ টার্গেট) অর্জন হয়নিÑএটা আমরা জানি। ব্যাংকিং রিস্ট্রাকচারিংয়ে অগ্রগতি ধীর; তবে কিছু পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইএমএফের মানদণ্ডে কি সেটা যথেষ্ট? যদি প্রোগ্রাম অনট্র্যাক থাকে, তাহলে ডিসবার্সমেন্ট (কিস্তি ছাড়) হবে না কেন? ইলেকশন তো একটা দেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াÑএটাকে পজিটিভ দিক হিসেবেই দেখা উচিত।

শেয়ার বিজ: তাহলে কি অর্থনৈতিক প্রশাসনে ধারাবাহিকতা থাকবে?

ড. জাহিদ হোসেন: অবশ্যই। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এগুলো তো আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। গভর্নর বা ডেপুটি গভর্নরদের মেয়াদ ও দায়িত্ব নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাই প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা থাকবে। আইএমএফও তো আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। তাই যুক্তিগতভাবে তাদের প্রোগ্রাম থেমে থাকার কোনো কারণ দেখি না।

শেয়ার বিজ: বেতন বৃদ্ধি ‘সেলফ ফাইন্যান্সিং’ বলা হচ্ছে এটা কতটা বাস্তবসম্মত?

ড. জাহিদ হোসেন: অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, বেতন বাড়ালে নাকি রাজস্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবেÑএই যুক্তি অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন। রাজস্ব বাড়ানো মানে কর-নীতিতে পরিবর্তন ও কাঠামোগত সংস্কার শুধু বেতন বাড়ালে রাজস্ব ‘অটোমেটিক’ বাড়ে না। এই হিসাবটা মেলাতে হবে আর এখন সেটাই মিলছে না।

শেয়ার বিজ: ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম বলেছে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে সহায়তা বন্ধ করেছে এটা কতটা সত্য?

ড. জাহিদ হোসেন: এই খবর পুরোপুরি বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেউই সহায়তা বন্ধ করেনি।

বিশ্বব্যাংকের নিয়ম হলো, যদি কোনো দেশ বাজেট সাপোর্ট নিতে চায় এবং আইএমএফের প্রোগ্রাম অনট্র্যাক থাকে, তাহলে সমস্যা হয় না। আইএমএফ এখনও বলেনি যে প্রোগ্রাম অনট্র্যাক নেই। তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তা থেমে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।

শেয়ার বিজ: তাহলে আপনি মূল সমস্যাটা কোথায় দেখছেন?

ড. জাহিদ হোসেন: আমার মনে হয়, আমরা কিছু একটা মিস করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ন্যান্স, রিফরম বিল, পলিসি কমিটির কাঠামো এ বিষয়গুলো এখন উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। হয়তো সেই প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু জুনে যখন আইএমএফ তিন সপ্তাহ ঢাকায় থেকে আলোচনা করে বোর্ডে রিপোর্ট দেয়, তখন তো সব ঠিকই চলছিল। এখন অক্টোবরে এসে হঠাৎ থেমে যাওয়া এটার একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

শেয়ার বিজ: সামগ্রিকভাবে বর্তমান দেশের অর্থনীতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. জাহিদ হোসেন: আইএমএফ ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে গত বছর ছিল প্রায় ৪ শতাংশ।

অতএব, এটা কোনোভাবেই ‘প্রবৃদ্ধি কমেছে’ বলা যায় না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি সব সংস্থার পূর্বাভাসই ৪.৮ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। শুধু সরকারের পূর্বাভাস কিছুটা বেশি, ৫.৫ শতাংশ। অর্থনীতি এখন কঠিন সময় পার করছে, কিন্তু ৫ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে বলা যাবে বাংলাদেশ ভালোই করছে। কারণ এটি এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি।