মুক্তা বেগম, গাজীপুর : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মতো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এই কুচক্রী মহলটি ব্রির সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য অব্যাহতভাবে কিছু নামসর্বস্ব ও অখ্যাত অনলাইন সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা ও নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করাচ্ছে। এতে গবেষণা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত এমনি একটি বানোয়াট ও মনগড়া সংবাদ ব্রির সব স্তরের বিজ্ঞানী-কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকশ্রেণি প্রত্যাখ্যান করে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব মনগড়া সংবাদ প্রচারের নেপথ্যে ব্রির কিছু অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী জড়িত। আরও অভিযোগ রয়েছে, তারা কর্মরত থাকাকালে অফিসের কাজ বাদ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী কাজে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য তারা দীর্ঘদিন সাসপেন্ড অবস্থায় থাকলেও বিগত সরকারের সময় সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে চাকরিতে পুনর্বহাল হয় এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভোল পাল্টে বিধিবহির্ভূতভাবে বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করতে থাকে। এমনকি তারা কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নামে সমিতি গঠন করে কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে পদ-পদবি বাগিয়ে নেয় এবং একজন বিতর্কিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীকে এই সমিতির উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করে। এই বিতর্কিত উপদেষ্টার নামে গাজীপুরে অবৈধ ফ্ল্যাট ব্যবসার নামে প্রতারণামূলকভাবে সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় দুর্নীত দমন কমিশনে ভুক্তভোগী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করে। তা ছাড়া এই চক্রের আরেক হোতা ব্রি যানবাহন শাখার একজন ড্রাইভার বলে জানা যায়। তিনি গাড়ি না চালিয়েই মাসের পর মাস ধরে বেতন নিচ্ছেন, যা লগবই চেক করলেই বেরিয়ে আসবে বলে জানা গেছে। এমনকি তিনি একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও অফিসের কাজ বাদ দিয়ে এবং কোনো অনুমতি ছাড়াই বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় থেকে গাজীপুরের আওয়ামী নেতাদের ছত্রছায়ায় পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে গাজীপুরের বিভিন্ন আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে তার অসংখ্য অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ভাইরাল হয়েছে। বর্তমানে তিনিও ভোল পাল্টে অফিসকে অস্থিতিশীল করছেন। ব্রি লাইব্রেরি শাখার একজন কর্মচারী সরকারের সোস্যাল মিডিয়া নীতিমালা তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে জামাতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ছবি এবং রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। কিছু দিন আগে তিনি বর্তমান সরকার দলকে তীব্র কটাক্ক করে ফেসবুকে লেখেন। এসবের স্কিনশট ও ডকুমেন্ট সবার মোবাইলে মোবাইলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও ব্রির প্রবিধানমালা ও সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারীর পক্ষে প্রকাশ্য রাজনীতি করা বা মতবাদ প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ নেই। এই কুচক্রীমহল সম্প্রতি ব্রি বোর্ডের সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ পেশিশক্তি খাটিয়ে তাদের কিছু আত্নীয়-স্বজনকে সমমানের পদ হিসেবে স্বীকৃত না হওয়া সত্ত্বেও বেআইনিভাবে আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে প্রকল্প পদ থেকে রাজস্ব খাতের পদে আত্তীকরণ করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে। তাছাড়া তারা বর্তমানে আউটসোর্সিং খাতে কর্মরত কিছু নিরীহ কর্মচারীকে তাদের চাকরির নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করেই তাদের উসকে দিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করছে। গুটি কয়েক বিজ্ঞানী তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে এসব কর্মচারীদের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লাটিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তাদেরকে ইন্ধন দিচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিযোগ করেন। তাদের মধ্যে এমন বিজ্ঞানীও রয়েছেন যিনি ফ্যাদিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ফ্যাদিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অবস্থান কর্মসূচির অগ্রভাগে ছিলেন। ইতোমধ্যে তার সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাছাড়া সাধারণ বিজ্ঞানীরা অভিযোগ করেন, তিনি পদোন্নতি মিটিংয়ের তারিখ হলে তার অনুগত প্রতিষ্ঠান বিরোধী উগ্র কিছু কর্মচারীকে উসকে দিয়ে পদোন্নতি সভা আয়োজনে বাধা প্রদান করেন এবং এভাবে সিনিয়র সহকারী পরিচালকের একটি পদে একজন কর্মকর্তাকে তার সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এক বছর পদোন্নতিবঞ্চিত রাখা হয়। বর্তমানে এই কুচক্রী মহলের অপতৎপরতায় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে পিএসওসহ সব পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে এবং গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে সাধারণ বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজের স্পৃহা নস্ট হচ্ছে। তাছাড়া গত বোর্ডের সিদ্ধান্তে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে যে এই বিজ্ঞানী ফ্যাসিস্ট আমলে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ২০২২ সালে তার বিভাগেরই একজন জ্যেষ্ঠ ও সজ্জন বিজ্ঞানীকে ডিঙিয়ে তথ্য গোপন করে প্রতারণামূলকভাবে সিএসও পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। তাছাড়া তিনি সেই সময়ে তৎকালিন ফ্যাসিস্ট প্রশাসনের নেক নজরে থাকার সুবাদে শুদ্ধাচার পুরস্কারও বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। তিনি একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান থাকাকালীন নিজ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চালু করেন। তাছাড়া তারও বিগত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এমপিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ অনেক ছবি ভাইরাল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি এই কুচক্রী মহলটি পরিচালকের (গবেষণা) নামে নিয়োগ বাণিজ্যের মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে। অথচ কর্মকর্তা নিয়োগ সংক্রান্ত ডিপিসি-১ এবং কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত ডিপিসি-২ উভয় কমিটিতেই পরিচালক (গবেষণা) একজন সদস্য মাত্র। ডিপিসি-১ সভায় মহাপরিচালক সভাপতি এবং পরিচালক (প্রশাসন) সদস্য সচিব এবং ডিপিসি-২ তে পরিচালক (প্রশাসন) সভাপতি এবং উপপরিচালক (প্রশাসন) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া উভয় কমিটিতেই কৃষি মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে থাকেন। তাছাড়া ডিপিসি-১ এ বিআরসি প্রতিনিধিও সদস্য হিসেবে থাকেন। জানা যায়, উচ্চ পর্যায়ের এই নিয়োগ কমিটি সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সাবধানতার সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ করে এবং ব্রির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ব্রি বোর্ডের অনুমোদনক্রমে তা কার্যকর হয়। তাছাড়া খবর নিয়ে জানা যায়, ব্রির সাম্প্রতিক পরীক্ষাটি টেলিটক এবং ঢাকার একটি স্বনামধন্য সম্পূর্ণ সিসি ক্যামেরার আওতাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে গ্রহণ করায় সর্বমহলে প্রশংসা কুড়ায়। তাছাড়া জানা যায়, ব্রি কর্তৃপক্ষ ব্রি’র ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো যোগদান করতে আসা প্রার্থীদেরও সঠিকতা শনাত্তদ্ধকরণের ব্যবস্থা করে এবং এর ফলে দুজন ভুয়া প্রার্থী শনাক্ত হয় এবং তাদের তাৎক্ষণিক ব্রি পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। এমনকি ওই মিথ্যা বানোয়াট সংবাদে শতভাগ প্রার্থী যোগদান না করা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ বিসিএস থেকে শুরু করে সব নিয়োগেই কিছু না কিছু প্রার্থী যোগদানে বিরত থাকেন এবং জানা যায়, ব্রি সরকারি নিয়ম মোতাবেক যেসব পদে প্রার্থী যোগদান করেনি, সেসব পদে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগ প্রদান করবে। এই কুচক্রী মহলটি নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি ও নিয়োগে বাধা প্রদান এবং তাদের অন্যায্য দাবি-দাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। ব্রির সচেতন মহল এই চক্রের দৌরাত্ম্য রোধে যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
