শেয়ার বিজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। গাজা থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের আঁচ এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লোহিত সাগর হয়ে এই উত্তাপ এখন সরাসরি উপসাগরীয় দেশগুলোর দোরগোড়ায়। একদিকে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের সামরিক তৎপরতা, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাল্টা আক্রমণ-সব মিলিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে শুধু ওই অঞ্চলের রাজনীতিই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাধারণ পাঠকের মনে এখন সবচেয়ে বড় দুটি প্রশ্ন-উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা বা প্রবাসীরা কেমন আছেন? আর এই যুদ্ধ বিশ্ববাজার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি: গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। গাজা ভূখণ্ডে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমান্ত সংঘাত এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরীয় এলাকা। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জাহাজ চলাচলের পথটি এখন কার্যত অচল।
এর পাশাপাশি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি ছায়াযুদ্ধের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা উপসাগরীয় দেশগুলোকে (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন) চরম সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও, যুদ্ধের যেকোনো সম্প্রসারণ তাদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। আধুনিক সমরাস্ত্র এবং ড্রোনের যুগে এই দেশগুলোর তেল শোধনাগার বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সন্দিহান।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশিদের অবস্থা: কেমন আছেন আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারি হিসাব মতেই, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কর্মরত আছেন। দেশের মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। যুদ্ধের ডামাডোলে এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলো চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরে সরাসরি কোনো যুদ্ধ বা গোলাগুলি হচ্ছে না, ফলে প্রবাসীরা শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদেই আছেন। সৌদি আরব বা দুবাইয়ের মতো শহরগুলোতে জনজীবন এখনো স্বাভাবিক। তবে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে যে মূল শঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
দুবাইপ্রবাসী একজন নির্মাণশ্রমিক ফোনে বলেন, ‘এখানে এখনও কোনো সমস্যা নেই, কাজ চলছে। কিন্তু মানুষের মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে। যদি যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করে, তবে বড় বড় প্রজেক্টগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন আমাদের কাজ থাকবে কিনা, তা নিয়ে সবাই চিন্তায় আছি।’
যুদ্ধের কারণে যদি এই দেশগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায় বা তেলের বাজারে বড় ধরনের ধস নামে, তবে দেশগুলো তাদের উন্নয়নমূলক কাজ কমিয়ে দিতে পারে। এতে নতুন করে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে সেখানে থাকা কর্মীদের বেতন কমানো বা ছাঁটাইয়ের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। দূতাবাসগুলো থেকে প্রবাসীদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য হটলাইন নম্বর চালু রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে যেকোনো আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য প্ল্যান-বি বা বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post