চট্টগ্রাম ব্যুরো: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বন্দরনগর চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ করে এক নজিরবিহীন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নগরীর অলিগলি, প্রধান সড়ক, ফুটপাত, খালের পাড় এবং সরকারি খাস জমিসহ হাজারো স্থানে কোনো ধরনের অনুমোদন বা ইজারা ছাড়াই বসেছে শত শত অননুমোদিত পশুর হাট। ফলে একদিকে যেমন নগরবাসী তীব্র যানজট ও দূষণে নাকাল হচ্ছেন, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। অবৈধ হাটের পাশাপাশি অনুমোদিত স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে চরম অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ। গত বছরের তুলনায় এবার পানির দরে বা নামমাত্র মূল্যে হাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে। আর এসব ইজারা প্রাপ্তির তালিকায় ঘুরেফিরে এসেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও যুবদলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের নাম। কোনো কোনো হাটে গত বছরের তুলনায় রাজস্ব কমেছে প্রায় দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির ঈদকে কেন্দ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের অভ্যন্তরে ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই দফায় মাত্র ৮টি হাটের অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত এই ৮টি হাটের ইজারা প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে চরম বিশৃঙ্খলা। এর মধ্যে মাত্র ৩টি হাটের জন্য গত ৭ মে আনুষ্ঠানিক দরপত্র (টেন্ডার) বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তার মধ্যে মাত্র দুটির দরপত্র ফরম জমা পড়ে এবং একটি হাটের বিপরীতে কোনো ইজারাদারই পাওয়া যায়নি। বাকি ৫টি অনুমোদিত হাটের জন্য চসিকের পক্ষ থেকে কোনো দরপত্র বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশ করা হয়নি! সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাট-বাজার ইজারা দেওয়া সংস্থাটির নিজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু এবার অনুমোদিত হাটে অস্বাভাবিক কম মূল্যে ইজারা প্রদান এবং হাজারো অবৈধ হাট থেকে এক টাকাও রাজস্ব না আসায়Ñচসিকের আর্থিক ক্ষতি কোটি কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুমোদিত হাটগুলোর ইজারামূল্য গত বছরের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের কম। আর ইজারাপ্রাপ্তদের প্রায় সকলেই স্থানীয় বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক পদধারী নেতা। নিচে কয়েকটি হাটের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
৩৭ নম্বর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের আনন্দবাজার-সংলগ্ন রিং রোডের পাশের খালি জায়গা ৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন হাসান মুরাদ। গত বছর এই হার্ট থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল ২০ লাখ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, এক হাটেই রাজস্ব কমেছে ১৫ লাখ টাকার বেশি। হাসান মুরাদ ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি। ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিং সিডিএ বালুর মাঠ ৭০ লাখ টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন মিজানুর রহমান। তিনি ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ স¤‹াদক। গত বছর এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। আগের বছর (২০২৪) ইজারা হয়েছিল ২ কোটি ২২ লাখ টাকায়। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই একটি হাট থেকেই চসিকের রাজস্ব কমেছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো রোডের পাশে টিএসপি মাঠ ৯ লাখ ২০ হাজার টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন মো. পারভেজ। তিনি যুবদল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গতবার এই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন টানেলের উত্তর পাশের আলমগীর সাহেবের বালুর মাঠ বরাদ্দ পেয়েছেন চট্টগ্রাম নগর কৃষক দলের সভাপতি মো. আলমগীর। তিনি গতবারের মতো এবারও রাজস্ব দিচ্ছেন ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। এবারের নতুন হাট ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের গলিচিপাপাড়া বারুনিঘাটা মাঠ সাড়ে ১২ লাখ টাকায় বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে জসীম উদ্দিনকে। জসিম উদ্দিন হালিশহর থানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দরপত্র ছাড়া এবং নামমাত্র মূল্যে দলীয় নেতাদের হাট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল স¤‹ূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় অস্থায়ী হাটগুলো বসেছে। যেসব জায়গার মালিকানা নিয়ে জটিলতা বা ঝামেলা আছে, সেগুলোতে প্রথাগত দরপত্র দেওয়া যায়নি। স্থানীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্ব ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জায়গার মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এই হাটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব কমেনি দাবি করে তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন গত তিন বছরের গড় দরের চেয়ে বেশি দরেই এবার হাটগুলো বরাদ্দ দিয়েছে। তবে বিগত বছরের নথিপত্র চসিকের এই দাবির স¤‹ূর্ণ বিপরীত চিত্রই প্রদর্শন করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ড. শাহাদাত হোসেন জানান, তিনি বিষয়টি স¤‹র্কে স¤‹ূর্ণ অবগত নন। তিনি বলেন, হাটগুলোর ইজারা প্রক্রিয়া এবং রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, সে ব্যাপারে আমি দ্রুতই খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাব।
দরপত্র ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় পশুর হাট বরাদ্দ দেওয়ার এই সংস্কৃতিকে চরম অন্যায় ও সুশাসনের পরিপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ স¤‹াদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি জানান, এটি চট্টগ্রামের জন্য নতুন কোনো চিত্র নয়। প্রায় সময় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রতিযোগিতাহীনভাবে হাটগুলো নামমাত্র মূল্যে বরাদ্দ নিয়ে নেওয়া হয়। যখন যে দল সরকার বা ক্ষমতার কেন্দে থাকে, সে দলের লোকজনই এই পশুর হাটগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজনৈতিক ভাগবাটোয়ারার কারণে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ করদাতা নাগরিকরা।
অনুমোদিত আটটি হাটের বাইরে পুরো চট্টগ্রাম মহানগরী এখন অবৈধ পশুর হাটে সয়লাব। নগরীর দামপাড়া, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, জিইসি মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর ও পতেঙ্গার বিভিন্ন প্রধান সড়কের ওপর বাঁশ গেঁড়ে, ত্রিপল টাঙিয়ে শত শত গরু-ছাগল সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এই অননুমোদিত হাটগুলো থেকে সিটি করপোরেশনের কোষাগারে কোনো অর্থ জমা পড়ছে না। উল্টো স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, রাজনৈতিক নামধারী ক্যাডার এবং পাড়া-মহল্লার টোকাইরা সিন্ডিকেট করে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের হাসিল ও টোল আদায় করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো স্কটে শুধু ট্রাকপ্রতি নামানোর জন্যই হাজার টাকা চাঁদা গুনতে হচ্ছে ব্যাপারীদের।
এদিকে সড়ক-মহাসড়ক সচল রাখতে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশে কোনো অবস্থাতেই পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশও (সিএমপি) পশুর হাটকেন্দি ক অননুমোদিত রাস্তা দখল, ফুটপাথ ও অবৈধ পার্কিং ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনার প্রতিফলন খুবই সামান্য। পুলিশের নাকের ডগাতেই দিন-রাত চলছে অবৈধ হাটের বেচাকেনা, যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মাইলের পর মাইল যানজট। পশুর হাটের এই অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ বিস্তারের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ নগরবাসী। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকছে গণপরিবহন ও অ্যাম্বুলেন্স। পশুর বর্জ্য, মূত্র এবং হাটের খড়কুটা যত্রতত্র ফেলার কারণে বাতাসে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা বর্ষার বৃষ্টির পানিতে মিশে পুরো নগরীর পরিবেশকে এক নরককুণ্ডে পরিণত করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অবৈধ হাট শুধু চসিকের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতিই করছে না, বরং এটি মহানগরের ট্রাফিক ব্যবস্থা স¤‹ূর্ণ ভেঙে ফেলেছে এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের স্কষ্ট দাবিÑআগামীতে ইজারা প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও ই-টেন্ডারিং নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক বিবেচনায় হাট বরাদ্দ দেওয়া চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী অবৈধ হাট ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

Print Date & Time : 23 May 2026 Saturday 3:18 am
কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে চসিক
শীর্ষ খবর,শেষ পাতা ♦ প্রকাশ: