Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 5:14 pm

ক্রমবর্ধমান অপরাধে আতঙ্কে জনজীবন

মো. শাহীন আলম : এক ঘোর অন্ধকার ছায়াÑদিন দিন গ্রাস করে নিচ্ছে পুরো ভূখণ্ডকে। সেটা কোনো মেঘ বা রাত্রির ছায়া নয়, সেটা হলো অপরাধপ্রবণতার ভয়ংকর ছায়া। শহর পেরিয়ে এই ছায়া পৌঁছে গেছে প্রান্তিক জনপদেও। শিশু-কিশোর, যুবক এবং বৃদ্ধÑসবাই যেন এই অপরাধ জগতের বাসিন্দা। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা উল্টাতে চোখে পড়ে ভয়াবহ সব অপরাধের চিত্র। কেউবা করেছে খুন, কেউবা ধর্ষণ কিংবা কেউ জড়িত চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা অন্য কোনো বড়সড় অপরাধের সঙ্গে। আর তাদের হাত থেকে রেহাই পায় না সমাজের কোনো শ্রেণির মানুষইÑসে হোক নারী কিংবা পুরুষ, শিশু কিংবা বৃদ্ধ, ধনী কিংবা গরিব। অপরাধ জগতের বিস্তৃতির ফলে জনজীবন আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।

প্রত্যেকের মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করে। এজন্য একজন মানুষ সবসময় তার জীবন নিয়ে টেনশনে থাকে কখন না কে এসে তার বুকে গুলি করে কিংবা পেটে ছুড়ি ঢুকিয়ে দেয়। মহিলারা সবসময় এই টেনশনে থাকে যে কোনো সময় যেন ধর্ষকের সম্মুখীন হয়ে নিজের সতীত্ব হারাতে হয়। ব্যবসায়ীরা সবসময় টেনশনে থাকে চাঁদাবাজিদের চাঁদা দিতে না পেরে কখন না জানি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়। এভাবে সমাজের প্রত্যেক শ্রেণিই এক অজানা ভয় নিয়ে নিজেদের দিন পার করছে। আর এই ভয়টা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যেভাবে অপরাধ জগতের বিস্তৃতি ঘটছে।

আমরা যদি এই ভূখণ্ডে নিয়মিত ঘটে যাওয়া বৃহৎ অপরাধগুলোর দিকে তাকাই তাহলে যে অপরাধটি সর্বপ্রথম নজরে আসে সেটা হলো হত্যা। আজকাল মানুষ সাধারণ কোন ঘটনা কে কেন্দ্র করেই একে অপরকে হত্যা করে ফেলে। ভাই ভাইকে, সন্তান পিতাকে, পিতা সন্তানকে আজকাল অহরহ হত্যা করছে। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা হলো ৩ হাজার ৭৬৭টি; যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৪৪০টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩২৭টি। অপরদিকে ২০২৩ সালে এ সংখ্যাটা ছিল ৩ হাজার ২৩টি, ২০২২ সালে ৩ হাজার ১২৬টি, ২০২১ সালে ৩ হাজার ২১৪টি, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৫৩৯টি এবং ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫৩টি খুনের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ প্রত্যেক বছরই ৩ হাজারের বেশি লোক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

এসব হত্যার নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, সম্পত্তির লোভ ও সম্পর্কের টানাপড়েনের মতো ঘটনার জেরে হত্যার ঘটনা বাড়ছে। এমনকি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।

এরপর চোখ তুলে তাকালেই যে ভয়াবহ অপরাধটি লক্ষ করা যায় সেটি হলো ধর্ষণ। এটি একটি জাতির কলঙ্কিত অধ্যায়। যখন একজন শিশু কিংবা নারী ধর্ষিত হয় তখন তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং তাকে বাকি জীবনটা এই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই কাটাতে হয়। আর এই অপরাধটা বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত এক বছরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের সংখ্যা হলো ৭৩০টি। তার মধ্যে শিশু ভিক্টিমের সংখ্যাই ৩৬৬। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৪২ জন ভিক্টিমকে। এগুলো শুধু বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর সংখ্যা। বাস্তবে এ সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা খুব কমই দেখা যায়।

দেশে চলমান আরও একটি বৃহৎ অপরাধ হলো চাঁদাবাজি। দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই আজ চাঁদাবাজরা আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। পরিবহন, ব্যবসা কিংবা কারখানাÑএমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে ভুক্তভোগীরা অতিষ্ঠ নয়। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার রিপোর্ট মতে শুধু দেশের পরিবহন খাত থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। রাজধানীসহ সারাদেশে বাস, ট্রাক, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, টেম্পো, লেগুনাসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে নানা নামে এই অর্থ আদায় করা হয়। এই চাঁদাবাজির পেছনে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের একাংশ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, এমনকি সড়কে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরাও সম্পৃক্ত। এই অর্থের বেশিরভাগই ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা হয়। প্রতিনিয়ত পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির ফলে পরিবহন ভাড়াও বাড়ে, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। দিনশেষে সব বোঝা গিয়ে পড়ে জনগণের ঘাড়ে। ‘সমঝোতা সিস্টেম’-এর নামে চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় আমজনতাকে। এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি আর বন্ধ হয় না।

এছাড়া দেশে প্রতিনিয়ত আরও নানা অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং সমাজজীবনের নানা স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। যেমন: ইভটিজিং, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা ও ব্যাংক ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, অর্থপাচার, কর ফাঁকি, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন, কালোবাজারি ও মজুতদারি, জমি দখল ও ভাঙচুর, অপহরণ, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, মাদক উৎপাদন, পাচার, ব্যবসা ও সেবন, বিশেষ করে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের অবাধ বিস্তার। একই সঙ্গে মানবপাচার ও শিশু পাচার, নারী ও শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, স্ত্রী নির্যাতন, শিশু শ্রমে বাধ্য করা এবং বৃদ্ধ নির্যাতনের মতো সামাজিক অপরাধও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনী জালিয়াতি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যানবাহন চুরি, অবৈধ পরিবহন পরিচালনাসহ নানা অপরাধ জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রযুক্তির বিস্তারের সাথে সাথে বেড়েছে সাইবার অপরাধওÍঅনলাইন প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া আইডি ব্যবহার করে প্রতারণা, ই-কমার্স জালিয়াতি এবং গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির প্রবণতা। পাশাপাশি পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধ যেমন নদী ও খাল দখল, পাহাড় কাটা, অবৈধ বালু উত্তোলন, বনজ সম্পদ লুণ্ঠন এবং বন্যপ্রাণী পাচারও দিন দিন বাড়ছে। এসব অপরাধের ক্রমবর্ধমান বিস্তার কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে না, বরং সমাজে নিরাপত্তাহীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং জনমনে গভীর উদ্বেগেরও জš§ দিচ্ছে। বর্তমান দেশে অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার হঠাৎ করেই হয়ে যায়নি। এর পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। যেমনÑপ্রথমত, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়: সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব। সমাজে যখন ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য মুছে যেতে থাকে এবং ব্যক্তিস্বার্থই হয়ে ওঠে ব্যক্তিজীবনের একমাত্র লক্ষ্য, তখন সে নিজের চাহিদা পূরণ কিংবা স্বার্থ হাসিলের জন্য নানা ধরনের অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। সে চিন্তা করে না যে তার কাজটি ঠিক না বেঠিক, তার অর্জিত পন্থাটা সৎ নাকি অসৎ। এভাবে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

দ্বিতীয়ত, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি: বর্তমান সময়ে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ হলো আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন একজন অপরাধী অপরাধ করেও সহজে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, অথবা বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে, তখন অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যায়। তখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং আরও নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পরে। তাদের দেখাদেখি অন্যদের মধ্যেও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার: বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক নেতারা অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। বিশেষ করে যখন নিজের দলের লোকেরা কোনো অপরাধের সাথে জড়িত হয় তখন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাঁচিয়ে দেয় কিংবা শাস্তি কম করে দেয়। আর যখন অপরাধীরা ক্ষমতার ছত্রছায়া পায়, তখন তারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে এবং তারা আবারও তাদের অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। এর ফলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।

চতুর্থত, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা হলো বেকারত্ব। দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষিত হয়েও কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে তাদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অধিকাংশ সময় এই হতাশা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় তারা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে সমাজে যখন ধনী-গরিব বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে, তখন তা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং অপরাধের জন্য উর্বর পরিবেশ তৈরি করে।

পঞ্চমত, মাদকাসক্তির বিস্তার: মাদকাসক্তি নিজে একটি অপরাধ হওয়ার পাশাপাশি এটি আরও অনেক অপরাধমূলক কর্মের কারণ হিসেবে কাজ করছে। মাদক মানুষের বিবেক ও বিচারবোধকে ধ্বংস করে দেয়। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের চাহিদা পূরণের জন্য চুরি, ছিনতাই কিংবা সহিংস অপরাধের পথেও পা বাড়াতে দ্বিধা করে না। ফলে মাদক সমস্যা শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

এছাড়াও প্রযুক্তির অপব্যবহার, পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও নেতিবাচক সংস্কৃতির প্রভাব এবং দ্রুত অর্থ ও বিলাসী জীবনের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণÑবর্তমান সমাজে অপরাধ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে নিতে হবে যথোপযুক্ত উদ্যোগ।

সর্বোপরি, চলমান অপরাধ রোধে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তবেই আমরা ক্রমবর্ধমান অপরাধকে রোখতে পারব এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে সুন্দর একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে পারব।

 

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া