Print Date & Time : 17 April 2026 Friday 11:21 am

ক্রুড অয়েল সংকটে ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ক্রুড অয়েল সংকটে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। রোববার বিকালে শেষবারের মতো সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর পর কার্যক্রম বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানটি। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পরবর্তী আমদানি চালান দেশে আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ইআরএল কর্তৃপক্ষকে। ইআরএল বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় বা ‘লো-ফিড’ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি জোরদার করায় সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি হবে না বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল বুধবার জ্বালানি বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রায় দুই মাস ধরে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ক্রুড অয়েলের চালান দেশে আসে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দেখা দিলে সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় থাকা দুটি এক লাখ টনের চালান বাতিল হয়ে যায়। ফলে টানা ৫৪ দিন দেশে নতুন কোনো ক্রুড অয়েল আসেনি।
ইআরএল কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা পাঁচ হাজার টন এবং অপরিশোধিত তেলের চারটি ট্যাংকের ডেড স্টক (মজুত ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা অপরিশোধিত তেল) তুলেও পরিশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। ইআরএল সাধারণত দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে থাকে। তবে ক্রুড সংকটের কারণে পরিশোধন কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টন করা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুত দুই হাজার টনের নিচে নেমে আসে।
নাম না প্রকাশের শর্তে ইআরএলের একজন কর্মকর্তা জানান, পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে প্রায় ৩৩ হাজার টন ক্রুড তেল ডেডস্টক ছিল। আর এসপিএম থেকে পাঁচ হাজার টন আনা হয়েছিল রিফাইনারিতে। এগুলো দিয়ে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু এটি অনিরাপদ অপারেশন। কারণ ডেডস্টকে ময়লা-বর্জ্য জমে থাকে। এগুলো যেকোনো সময় পাম্পে আটকে যেতে পারে। যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। ইআরএলের আরেক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, রোববার বিকালে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ট্যাংকের তলানির ১ দশমিক ৫ মিটারের মতো ডেডস্টক ধরা হয়। রোববার বিকালে তা এক মিটারের নিচে নেমে যায়। ফলে আর তা ব্যবহার উপযোগী নয়। আর ডেডস্টকের তেলে থাকা বর্জ্য, সøাগের কারণে প্ল্যান্টের ক্ষতি হতে পারে। এসব বিবেচনায় পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইআরএলে পরিশোধন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেস অয়েলসহ ১৬ ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এ কারণে ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিপিসির তথ্য বলছে, মার্চ মাসে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল নিয়ে ১৭টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আটটি জাহাজে ২ লাখ ৩১ হাজার ২২৯ টন ডিজেল এসেছে। এছাড়া ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চারটি চালানে ২২ হাজার টন ডিজেল আনা হয়েছে। এপ্রিলেও দুটি ডিজেল, একটি অকটেন ও একটি ফার্নেস অয়েলের জাহাজ দেশে পৌঁছেছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েলের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এ চালানের জন্য ঋণপত্রও খোলা হয়েছে। আগামী ২১ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে জাহাজটির রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এটি আরব সাগর হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে। এদিকে ক্রুড তেল সংকটের অস্থিরতার মধ্যে সরকার মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস থেকে এক লাখ টন ক্রুড কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই চালানের সার্বিক ব্যয় এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ডেডস্টক দিয়ে ইআরএলের কার্যক্রম চালুর চেষ্টা ছিল। এরপরও যদি ইআরএল বন্ধ থাকে, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হবে না। কারণ দেশে পর্যাপ্ত পরিশোধিত তেল আমদানি রয়েছে। চাহিদা অনুসারে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর অপরিশোধিত তেলের একটি চালান চলতি মাসের শেষ দিকে আসতে পারে।