Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 2:40 am

‘ক্লিন ইমেজ’ গ্রুপের হাতে যাচ্ছে এক্সিম ব্যাংক

আনোয়ার হোসাইন সোহেল: এক্সিম ব্যাংককে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ‘ক্লিন ইমেজ’ হিসেবে পরিচিত একাধিক ব্যবসায়ী গ্রুপের হাতে শেয়ার ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতার কারণে চাপে পড়া এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসিকে (এক্সিম ব্যাংক) পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়ে পড়া ও একীভূত করা কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক পুনর্গঠনের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোতে পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সূত্র বলছে, একসময় দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানা অনিয়মের কারণে আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। বিশেষ করে পরিচালকদের প্রভাব খাটিয়ে নিয়মবহির্ভূত ঋণ অনুমোদন, নাসা গ্রুপকে অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা প্রদান এবং কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ জামানত ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির বেশ কয়েকটি বড় ঋণ হিসাব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাতে সম্প্রতি একীভূতকরণের আলোচনায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার পরিবর্তে নতুন বিনিয়োগকারী আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেই তালিকায় এক্সিম ব্যাংকের নামও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ক্লিন ইমেজ’ হিসেবে পরিচিত আকিজ গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপের মতো বড় যেসব ব্যবসায়ী গ্রুপ অতীতে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি বা আর্থিক অনিয়মে জড়ায়নি, তাদের মাধ্যমে ব্যাংকটির পরিচালনা কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। নতুন বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়া হতে পারে, যাতে বর্তমান বিতর্কিত পরিচালকরা ধীরে ধীরে বেরিয়ে যান।
একজন ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এক্সিম ব্যাংককে বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে যেতে দেওয়া হবে না। এটি একটি বড় ব্যাংক এবং এর বিপুলসংখ্যক আমানতকারী রয়েছে। তাই নতুন উদ্যোক্তা আনার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে পুনর্গঠন করার চিন্তা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক সুনাম এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি মেনে চলার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ব্যাংক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু মালিকানা পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ পুনঃতফসিল বা আদায়ের কার্যকর উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর গ্রাহকদের উদ্বেগ বেড়েছে। এ অবস্থায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টেকসইভাবে পুনর্গঠন করা না গেলে পুরো খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং গ্রাহকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ও স্বনামধন্য উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এক্সিম ব্যাংক আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং নতুন বিনিয়োগকারীরা কতটা কার্যকরভাবে ব্যাংক পরিচালনা করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান উদ্যোগের মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের এই পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সফল হলে এটি দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের একটি নতুন মডেল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
এর মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সময়ে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক থেকে এক্সিম ব্যাংক বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, সরকার ব্যাংকিং খাতে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেÑএমনটাই মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর আবার পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএই অর্থের বিপরীতে সরকার কী ধরনের রিটার্ন পাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, সরকার এখন পর্যন্ত সেই অর্থের যথাযথ প্রতিফল পাচ্ছে না। তার মতে, সরকারের পদক্ষেপগুলো জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতেও ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। এরপর ব্যাংক রেজল্যুশন আইন এবং এর ১৮(ক) ধারা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার বলছে দুর্বল ব্যাংকগুলো আবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএ ধরনের বিধান কেন রাখা হলো? যদি শুরু থেকেই বলা হতো যে ব্যাংকগুলো দক্ষ ও যোগ্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে, তাহলে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যেত।
মো. মাজেদুল হক উদাহরণ দিয়ে বলেন, অতীতে কিছু ব্যাংক বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পর সফলভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দায়িত্ব নেওয়ার কারণে সেই ব্যাংকগুলো ভালো করেছে। বর্তমানে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, সরকারও এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। যাদের কাছে ব্যাংক হস্তান্তরের চিন্তা করা হচ্ছে, জনগণ তাদের নিয়ে আস্থাশীল নয়। আবার যারা আগ্রহ দেখাচ্ছে, তাদের অনেকের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যদি একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তা দ্রুত শেষ করতে হবে। অন্যথায়, ব্যাংকগুলো এমন ব্যবসায়ী বা শিল্পগোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করতে হবেÑযাদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে, যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো বড় আর্থিক অনিয়ম বা মামলা নেই এবং যারা আর্থিকভাবে সক্ষম এবং স্বনামধন্য।
মো. মাজেদুল হকের মতে, জনগণ এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা আছেন, সেটির ওপর। বোর্ড সদস্যদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি থাকলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার ইতোমধ্যে যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে নতুন উদ্যোক্তাদের। স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধার করার মতো আর্থিক শক্তি ও দক্ষতা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো জনগণের আমানত। তাই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেটি সম্ভব হবে তখনই, যখন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির শিল্পগোষ্ঠীর হাতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হবে।
একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, প্রথম যখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু করা হয়, তখন সরকার ছাড়া আর কেউ অর্থের জোগানদাতা ছিল না। স্বাভাবিকভাবে সরকারের হাতেই মালিকানা তুলে দেওয়া হয় এবং তুলে দেওয়ার সময় বলা হয়েছে, সরকার এটাকে নার্সিং করবে। স্বাস্থ্য কিছুটা ভালো হওয়ার পর সরকার-বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোকে ছেড়ে দেবে। সরকার চিরস্থায়ীভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা গ্রহণ করেনি। কবে নাগাদ মালিকানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেবে সেটা নির্ভর করবে আদৌ বেসরকারি মালিকানা নেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে কিনা তার ওপর। এক্ষেত্রে গ্রাহকের আমানত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সহায়তার যোগ ফলটা তাদের সম্পদের তুলনায় অনেক কম। এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ যদি মনে করে সাড়ে ৭ শতাংশ দিয়ে আমরা ওই ব্যাংকের মালিকানায় ফেরত আসতে চায় সে কি পাবে? কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায় আমানতের চেয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এমনভাবে কেউ যদি ঋণের বোঝা মাথায় চাপিয়ে নিয়ে ব্যাংকের মালিকানায় আসতে চায় তাদের ওয়েলকাম বা স্বাগতম।
জানা গেছে, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার তার সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের সব দায় মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থঋণসহ বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে করা একাধিক মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এদিকে একইভাবে একীভূতকরণ থেকে বেরিয়ে নিজেদের মালিকানা ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।