শেয়ার বিজ ডেস্ক : অক্টোবরের শুরুতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একই গ্রামের ১১ জন ব্যক্তির শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি। এ খবরে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সমকালের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, আক্রান্ত গরু জবাই করে মাংস কাটার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়।
অ্যানথ্রাক্স নতুন কোনো রোগ নয়। এটি প্রাচীন একটি রোগ, দেখতে চর্মরোগের মতোই। অ্যানথ্রাক্স নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে রোগটি সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত স্থানে গুটি গুটি রূপ নিয়ে বহুদিন থাকতে পারে। মাঝে মাঝে যখন এটি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে তখন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে রোগটি দেখা দেয়। তখনই সাধারণত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খামারে গবাদি পশুর মধ্যে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিপুলসংখ্যক মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী এ রোগ টিকে থাকতে পারে। ঘাস কিংবা মাটিতে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া থাকে, গবাদি পশু যখন ঘাস খেতে যায়, তখন ঘাস কিংবা মাটি থেকে প্রাণিদেহে প্রবেশ করে এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে। আবার ধারালো ঘাসে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে সেখান থেকেও অ্যানথ্রাক্স সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ যখন এ ধরনের আক্রান্ত পশু স্পর্শ করে, মাংস কিংবা চামড়া কাটাকাটি করে কিংবা রক্ত গায়ে লাগে, সেখান থেকেও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হতে পারে। পর্যাপ্ত সিদ্ধ না করে মাংস খেলেও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা, পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে ব্যাকটেরিয়াটি শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আরো বিরল হচ্ছে, রোগটি জীবাণুনাশক পাউডারের মাধ্যমে প্রাণিদেহে ছড়াতে পারে, বিশেষত যারা ট্যানারিতে কাজ করে তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ব্যাকটেরিয়া পেটে প্রবেশ করতে পারে, যেখান থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়। এসব পাউডার জীবাণুনাশক কাজে ব্যবহৃত হয়, যা পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছে অ্যানথ্রাক্স আক্রমণ করতে পারে। এ ধরনের কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় অ্যানথ্রাক্স হলে মৃত্যুহারের আশঙ্কা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তাই এ ধরনের জীবাণুনাশক পাউডার ব্যবহারের আগে ল্যাবরেটরিতে এগুলো পরীক্ষা করে দেখতে হবে এখানে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা। বিশেষত স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি থাকলে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ।
একটি বিষয় এখানে বলে রাখা জরুরি। মানুষ থেকে মানুষে এ রোগ ছড়ায় না, গবাদি পশু থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বর্তমানে এ রোগের আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে এবং এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনাও পাওয়া যায়। আইইডিসিআর আক্রান্ত মানুষের ব্যাপারে তদারক এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ আক্রান্ত প্রাণীর তথ্য সংগ্রহ করে। আমরা যখন দেখি, কোনো ব্যক্তির শরীরে কোনো অংশে রোগটির উপসর্গ দেখা দিয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ ব্যাপারে অবহিত করি। এরপর দায়িত্বশীল চিকিৎসক এসে খুঁজে দেখেন, কোনো গবাদি পশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ কিংবা মারা গেছে কিনা। আর ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যত গবাদি পশু রয়েছে, সবটাকে অ্যানথ্রাক্স টিকা দেয়া হয়।
বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স টিকা তৈরি হয় এবং এর খরচও খুব সামান্য। সুতরাং অতিরিক্ত আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই।
চামড়ার ওপর প্রয়োজনীয় মলম, অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা অন্যান্য ওষুধও এখন বাজারে সহজলভ্য। তবে রোগের ব্যাপারে কোনোভাবে অবহেলা করা যাবে না। কারণ পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে এটি প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তাই যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ী ওষুধ সেবন ও পরামর্শ মেনে চলতে হবে। অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধযোগ্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের কতিপয় নিয়ম পালন করা জরুরি। এ রোগে আক্রান্ত গবাদি পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে কিংবা স্পর্শ করতে গেলে হাতে গ্লাভস পরা জরুরি।
মাঝে মাঝে আমরা দেখি, অনেকে অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়ে আক্রান্ত পশু জবাই করে। কিন্তু এ ধরনের কাজই অ্যানথ্রাক্স ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ। তাই এ কাজ বন্ধ করতে হবে। যারা গবাদি পশুর খামার করেন, তারা কোনো গবাদি পশু আক্রান্ত হলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পশু ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। কোনো পশু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পুড়িয়ে ফেলাই উত্তম। তবে আমাদের দেশে পোড়ানোর সংস্কৃতি নেই। এ ক্ষেত্রে মাটির গভীরে পুঁতে ফেলাই উচিত, যাতে কুকুর কিংবা অন্য কোনো প্রাণী এটি খুঁড়ে বাইরে নিয়ে আসতে না পারে।
এ ব্যাপারে আরো দু-একটি ব্যাপারে সচেতনতা জরুরি। সমাজে কিছু অসাধু চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছে, যারা মাটি খুঁড়ে মৃত প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে পারে। এসব কাজ তাদের নিজেদের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি আশপাশের মানুষের জন্যও ক্ষতিকর। কেননা, ট্যানারিতে কর্মীদের কিংবা অন্য কোনোভাবে সরবরাহ করতে গিয়ে মানুষের হাত কিংবা শরীরের কোনো অংশ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে পাহারার বিষয়ও আছে।
বাংলাদেশের যে ধরনের পরিবেশ, তাতে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু টিকে থাকার জন্য বেশ অনুকূল। এখানে বৃষ্টি হয়, একটু শুকিয়ে যায়, আবার বৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের যে কোনো জায়গায় অ্যানথ্রাক্স হতে পারে। সে জন্য বলিষ্ঠ কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ভারত থেকে যেসব গরু আমদানি করা হয়েছিলো, তার কিছু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ছিলো। সুতরাং গরু আমদানি কিংবা সীমান্ত এলাকায় গবাদি পশুর ওপর নজরদারি বাড়ানো দরকার।
এসব আশঙ্কা কমিয়ে আনতে ব্যক্তির যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায় আছে। যেমন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত গবাদি পশুর চিকিৎসা কিংবা মারা গেলে মালিক বা কৃষকের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ফলে চিকিৎসা খরচের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে, যাতে খামারিরা অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন। কারণ খামারি গবাদি পশু মাটিতে চাপা দেয়ার মধ্য দিয়ে কেবল নিজের জন্যই কাজটি করেন না, বরং সমাজ ও প্রতিবেশীর প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণ করেন। এজন্য অবশ্য সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্তকে আর্থিক সহযোগিতা করা, যা খামারিদের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করার পথ বিস্তৃত করবে। রোগটি প্রতিরোধের দায়িত্ব যেহেতু মূলত সরকারের, সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ক্ষতিপূরণ দেবে না কেন?
এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতাও গড়ে তোলা জরুরি। গবাদি পশুর মালিক, পশু চিকিৎসক, ট্যানারি কর্মী, ব্যবসায় মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সামষ্টিক সচেতনতা সৃষ্টি না হলে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে বিশেষত সরকারি দপ্তরগুলোকে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
এস এস/
