নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : এক সপ্তাহ আগেও চিনির দাম মণপ্রতি ছিল ৩ হাজার ২৫০ টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ চিনির দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের চিত্র এটি। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্নমুখী চাপে চিনির দাম দফায় দফায় কমলেও চলতি সপ্তাহে বাজারে দেখা মিলল উল্টো দৃশ্য। সিন্ডিকেট কারসাজিতে গুরুত্বপূর্ণ এই পণ্যের দাম হঠাৎ করেই বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাদা চিনি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের দাবি, আসন্ন রমজান ও নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে মিলার সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, গত বছর সরকার সাদা চিনি আমদানির সুযোগ দেওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং দামও নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে সরাসরি সাদা চিনি আমদানি বন্ধ থাকায় পরিশোধিত চিনির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।
এদিকে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে কারখানার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিংয়ের কারণে পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। এতে মিল গেট থেকে চিনি সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে মিলভেদে ডিও বা ডেলিভারি অর্ডার পেতে ৮ থেকে ১১ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনির পাইকারি দর ছিল ৪ হাজার ৪৪০ টাকা। এরপর কয়েক মাস টানা কমে গত নভেম্বরের শেষের দিকে তা ৩ হাজার ২১০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে এই নিম্নমুখী প্রবণতা থমকে দাঁড়িয়েছে। বাজারে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩ হাজার ২৫০ টাকার নিচে। যদিও পাইকারি বাজারের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো খুচরা বাজারে পুরোপুরি পড়েনি, তবে পাইকারিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে দ্রুতই সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান বলেন, গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে সাদা চিনি আমদানির সুযোগ দেওয়ায় বাজারে চিনির সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে বর্তমানে সরাসরি সাদা চিনি আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে পরিশোধিত চিনির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। একই সঙ্গে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে কারখানার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং করতে হয়। এই সংস্কার কাজের জন্য পরিশোধন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মিল গেট থেকে চিনি সরবরাহ নিতে এখন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সিরিয়াল দিতে হচ্ছে, যা বাজারে সরবরাহের স্বাভাবিক গতি কমিয়ে দিয়েছে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে মিলভেদে ডিও বা ডেলিভারি অর্ডার পেতে ৮ থেকে ১১ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই মূল্যবৃদ্ধিকে পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করেছে।
ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা এখনই পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আমরা মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সুতরাং এই মুহূর্তে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। রমজান আসছেÑএই অজুহাতে অসাধু মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। বর্তমানে প্রশাসন জাতীয় নির্বাচনের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগে বাজার তদারকিতে কিছুটা শিথিলতা দেখা দিয়েছে। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে তারা। আগে দেখা যেত, পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে সরকার ব্যবসায়ীদের ডেকে কারণ জিজ্ঞাসা করত। কিন্তু এখন সে ধরনের জবাবদিহিতা আর দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারের বর্তমান যে পরিস্থিতি, তা একা কোনো সাধারণ ভোক্তার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি নিয়ন্ত্রণে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। এখনই যদি সমন্বিতভাবে বাজার তদারকি জোরদার করা না হয়, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
চট্টগ্রাম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহিদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কম। এদিকে সরকার শুল্কও কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে দাম আরও কম হওয়ার কথা, কিন্তু দাম সেভাবে কমেনি। এর মধ্যে দাম আরও বাড়ানো হয়েছে। মিল মালিকরা বেশি লাভ করছে। দামের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া উচিত।’
ভোক্তা অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে শুনতে পাচ্ছি। যদি আসলেই এমন কিছু হয়ে থাকে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post