এফ আই মাসউদ: নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে ২০২৪ সালের মে মাস থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভুয়া ভিসা ও শ্রমিকদের শোষণ নিয়ে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আবারও চালু হচ্ছে এই বাজার। এতে বাড়বে কর্মসংস্থান, কমবে বেকারত্ব। প্রবাসী আয়ে অর্থনীতিতে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিশর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও ৯৫ শতাংশ গেছে মাত্র পাঁচটি দেশে, যা বাজার সংকোচনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। অন্যদিকে নারী কর্মী প্রেরণেও বড় ধস নেমেছে, ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ কমেছে।
মালয়েশিয়ার কৃষি, নির্মাণ, প্ল্যান্টেশন, উৎপাদন ও সেবা খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় সাত লাখ বৈধ বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কাজ করছেন। এ ছাড়া প্রায় দেড় লাখ অবৈধ কর্মীও সেখানে কাজ করছেন, যাদের বৈধকরণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ৮ম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মিল ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও জনপ্রিয় গন্তব্য।
শ্রম ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে মালয়েশিয়া এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার শর্ত বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের জন্য সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা, কর্মস্থল ও আবাসন পরিদর্শন, আন্তর্জাতিক অডিট ও রেটিং ব্যবস্থা। তবে অভিবাসন ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
গত ৯ এপ্রিল কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর বৈঠক হয়। এরপর উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এবার দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনলাইন সিস্টেম এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগ করা হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করে ‘জিরো কস্ট’ বা অভিবাসন ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুব শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উš§ুক্ত হবে।
‘বিশেষ করে, বিদ্যমান জটিল আইন কিছুটা শিথিল করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে বাংলাদেশি কর্মীরা সহজে এই বড় শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারে। অবৈধভাবে অবস্থানরত শ্রমিকদের বিষয়েও দেশটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তাদের জন্য সম্ভাব্য সমাধান খোঁজার আলোচনা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করে পাঠানো, জনশক্তি রপ্তানির খরচ কমানো এবং সিন্ডিকেট ভেঙে স্বল্প খরচে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া জানিয়েছে, এসব বিষয় পর্যালোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘সফরকালে আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার সহজ করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।’
ক্রেডিবল রিক্রুটমেন্ট অ্যাজেন্সি নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘এটি নতুন কোনো সিন্ডিকেট গঠনের উদ্যোগ নয়। মালয়েশিয়ার জন্য শ্রমিক পাঠানো সব দেশের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে। নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে এজেন্সি নির্বাচন করা হবে। স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে অভিবাসন ব্যয় কমানো হবে। বেশি সংখ্যক মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।’
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার আবার সচল করতে সরকার কাজ করছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত সময়ের মধ্যে খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমবাজারে শুধু মালয়েশিয়া কেন, আমরা সব দিকে আলোচনা করেছি। যারা ফিরে এসেছেন, তাদের ভিসা এক্সটেনশনের জন্য আলোচনা করছি। ভিসাসংক্রান্ত সমস্যা হলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে কূটনৈতিকভাবে আমরা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর কাজ করছি। প্রতিদিনই আমরা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি।’
মালয়েশিয়া সফর ও আলোচনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার স্বাক্ষর করেছি, সেটি আমাদের ফেবারে আছে। অনুষ্ঠিত বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্রাদার হিসেবে সম্বোধন করেছেন।’
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ সাত লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন সৌদি আরব গেছেন। এরপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ, এক লাখ সাত হাজার ৫৯৬ জন কাতারে; ৬ শতাংশ, ৭০ হাজার ১৭৭
জন সিঙ্গাপুরে; ৪ শতাংশ, ৪২ হাজার ২৪১ জন কুয়েতে ও ৪ শতাংশের কাছাকাছি, ৪০ হাজার ১৩৯ জন গেছেন মালদ্বীপে। এরপর ১৩ হাজার ৭৫২ জন গেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ১২ হাজার ৩০১ জন গেছেন জর্দান, ১২ হাজার ২৫১ জন গেছেন কম্বোডিয়ায়, ৯ হাজার ৩৬৫ জন গেছেন ইতালি ও ছয় হাজার ৬৫০ জন গেছেন কিরগিজস্তান। অর্থাৎ বেশির ভাগ কর্মীই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন।
জানা যায়, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মায়ানমার, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মী নিচ্ছে জাপান। এ তালিকায় ২০১৯ থেকে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। জাপানের কোম্পানিগুলো কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। শ্রমিকসংকট চরম আকার ধারণ করায় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোক চাইছে। শর্ত হচ্ছে, কর্মীদের জাপানি ভাষা জানা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি যে পেশায় কাজ করতে চান, সেই দক্ষতা থাকতে হবে। আপাতত কেয়ারগিভার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং, ওয়েল্ডিং ও অটোমোবাইল মেকানিক খাতে বেশি লোক নিচ্ছে তারা। কিন্তু দক্ষতা না থাকায় সেই সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। গত সাত বছরে বেশ কিছু জাপানি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এখনো খুব বেশি সফলতা আসেনি। একই অবস্থা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কোরিয়ায়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আমরা যদি দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারি, তাহলে কিন্তু কম লোক দিয়েও রেমিট্যান্স বাড়বে। আমাদের যদি দক্ষ লোক থাকে, তাদের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন থাকে, তাহলে যাদের কর্মী দরকার তারাই খুঁজে নেবে। বিএমইটির যেসব প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে সেগুলোর আধুনিকায়ন করে ভাষা শিক্ষায় জোর দিতে হবে।
