বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা দীর্ঘদিনের সংকট। এই সংকট নিরসনে কার্যকর সংস্কার, কঠোর জবাবদিহি এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে বারবার ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হচ্ছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এ সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের বড় একটি অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এ বাস্তবতায় খেলাপিদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো মানে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের প্রতি অন্যায় করা। যারা সময়মতো ঋণ শোধ করেন, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা পান না; অথচ বছরের পর বছর ঋণ না দেওয়া প্রভাবশালী গ্রাহকরা বারবার ছাড় পেয়ে যান। এতে সৎ গ্রাহকদের মাঝে হতাশা তৈরি হয় এবং ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
এ ধরনের পুনঃতফসিল নীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলোÑ এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করা যায়। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো সম্ভব হলেও বাস্তবে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হয় না। বরং দুর্বল ঋণ হিসাবকে সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখিয়ে সমস্যা দীর্ঘায়িত করা হয়। এর ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট দুর্বল হয়, নতুন ঋণ বিতরণ কমে যায় এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন নির্দেশনায় পূর্বে বিশেষ সুবিধা পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানকে আবারও নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো দায় পরিশোধ না করেও নতুন ঋণ নেওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। এটি নৈতিক ঝুঁকি বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি ঋণখেলাপিকে উৎসাহিত করবে।
ঋণখেলাপি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার, আর্থঋণ আদালতের সংস্কার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং দায়ী পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু এসব কাঠামোগত সংস্কারের বদলে সহজ পথ হিসেবে বারবার ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক খাত একটি দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। এই খাত দুর্বল হলে শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানÑসবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই খেলাপিদের প্রশ্রয় দিয়ে নয়, বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নবগঠিত সরকার অনেক অব্যবস্থাপনাই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সেগুলোর কোনটি টেনে নেবে আর কোনটি ঝেড়ে ফেলবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারের। কাজেই খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারকে যুগোপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে আরও গভীর আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে পারে দেশ।

Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 4:20 am