ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : একসময় যে শহরকে বলা হতো দেশের বস্ত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র, সেই নারায়ণগঞ্জেই আজ টেক্সটাইল খাত গভীর সংকটে। মিলের চিমনি আছে, মেশিন আছে, শ্রমিক আছে; নেই শুধু কাজের নিশ্চয়তা। গুদামে জমে থাকা অবিক্রীত সুতার স্তূপ যেন শিল্পের বর্তমান দুর্দশার নীরব সাক্ষী। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগÑবন্ড সুবিধার অপব্যবহার, ভুল নীতি এবং বিদেশি সুতার আগ্রাসনে দেশের স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো এক ভয়াবহ অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।
বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আশির দশকে পোশাক তৈরিতে সুতার অপচয়ের হার ছিল ১৫ শতাংশ। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সেই হার কমার কথা থাকলেও বাস্তবে তা বাড়িয়ে ৩২ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সুতা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করতে পারছে। এই অতিরিক্ত সুতা পোশাক উৎপাদনে ব্যবহার না হয়ে খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, তুলা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হলেও ফিনিশড সুতা আমদানিতে কার্যত কোনো শুল্ক নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করপোরেট কর, টার্নওভার কর ও ভ্যাটের চাপ। ফলে দেশীয় মিলগুলো উৎপাদন খরচে পিছিয়ে পড়ছে।
নারায়ণগঞ্জের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা বলেন, একসময় এই শহরের স্পিনিং মিলগুলোই দেশের বস্ত্রখাতের ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। প্রাচ্যের ডান্ডি নামে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প ধসে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ বদিউজ্জামান বদু বলেন, প্রায় ৪৬ বছর ধরে বন্ড সুবিধা চালু রয়েছে। এই সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দেওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই সুবিধার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সুতা ও কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো টিকতে পারছে না।
তিনি বলেন, আজ যদি দেশের স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন ভারতসহ অন্য দেশগুলো সুতার বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে। তখন তারা দাম বাড়িয়ে দেবে। করোনার সময় তুলা রপ্তানি বন্ধ করে ভারত যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, সেটাই আবার ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সিনিয়র নেতা এম সোলায়মান বলেন, দেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে মূলত স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড শিল্পের কারণে। কিন্তু যদি স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো ধসে পড়ে, তাহলে পোশাকশিল্পও দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, ট্যারিফ কমিশন ইতোমধ্যে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে অদৃশ্য বাধা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বিষয়টি আটকে আছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা ও কাপড় আমদানি করে তা কালোবাজারে বিক্রি করছে। এই চক্রের সঙ্গে কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। অন্যের বন্ড লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে কমিশনের ভিত্তিতে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। এর ফলে শুধু শিল্প নয়, রাষ্ট্রীয় রাজস্বও বিপুল পরিমাণে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে বন্ড সুবিধার সুতা বিক্রির স্থায়ী বাজার গড়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার, নরসিংদীর মাধবদী ও বাবুরহাট, পাবনা এবং সিরাজগঞ্জের বেলকুচি এমন বাজারের উদাহরণ। রাজধানীর ইসলামপুরেও গড়ে উঠেছে চোরাই কাপড়ের বিশাল হাট।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বন্ড কমিশনারেট মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটছে না।
বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে স্পিনিং, উইভিং এবং ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিল মিলিয়ে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে মিলের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮৬৯টি। এই খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের জিডিপিতে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের অবদান ২০ শতাংশেরও বেশি।
বর্তমানে বিটিএমএর সদস্য মিলগুলো নিট পোশাকশিল্পের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন পোশাক শিল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করছে। কিন্তু বন্ড সুবিধার অপব্যবহার অব্যাহত থাকলে এই সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মিল মালিকরা জানিয়েছেন, বন্ড সুবিধায় বানের পানির মতো সুতা আমদানি করা হচ্ছে। এলসিতে নিম্ন কাউন্টের সুতা দেখিয়ে বাস্তবে উচ্চ কাউন্টের সুতা আনা হচ্ছে। এমনকি অস্তিত্বহীন মিলের নামেও কাপড় আমদানি করে তা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
ফলে দেশীয় শিল্প ভয়াবহ অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। স্থানীয় মিলগুলো উৎপাদিত সুতা বিক্রি করতে না পেরে গুদামে জমিয়ে রাখছে। ইতোমধ্যে ৫০টির বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত লিটল গ্রুপের ইন্টিমেট স্পিনিং মিলের দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার ৫০০ পাউন্ড সুতা। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় সেখানে অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে।
লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘ঈদের আগে সাধারণত সুতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু এবার সেই চাহিদাও নেই। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা কম দামে বাজারে চলে যাওয়ায় দেশি মিলগুলোর সুতা বিক্রি কমে গেছে। তিনি বলেন, লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন কারখানা চালানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন না হলে অনেক মিল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও টেক্সটাইল শিল্পকে বিপদে ফেলেছে। কয়েক বছর ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে সুতাকলগুলো। ২০২৩ সালে ক্যাপটিভ জেনারেটরে ব্যবহƒত গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সুতা উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ায় সেখানকার ব্যবসায়ীরা কম দামে সুতা বিক্রি করতে পারছেন। বর্তমানে ভারতীয় সুতার দাম দেশি সুতার চেয়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ সেন্ট কম।
বিটিএমএর নেতারা জানান, দেশের স্পিনিং মিলগুলো বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। তবুও গুদামে পণ্য জমে যাচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তত্ত্বাবধানে একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠন করা উচিত। এই কমিটির মাধ্যমে বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের গুদামগুলোয় নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কাস্টম হাউসগুলোতে আমদানি করা পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য আধুনিক অটোমেটেড মেশিন স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নীতিগত সহায়তা জরুরি। নইলে একসময় দেশের স্পিনিং ও উইভিং শিল্প ধসে পড়বে। তখন বিদেশি সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে দেশের পোশাকশিল্প। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশ যদি শুধু কাটিং ও সেলাইয়ের দেশ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
এই বাস্তবতায় শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার কি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে একসময় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত ইতিহাসে পরিণত হবে?
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post