নিজস্ব প্রতিবেদক : গণমাধ্যমের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু মবের পক্ষ থেকে আছে, আর এই মবকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এই সরকারÑএমন মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ।
গতকাল বুধবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সংস্কার: বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সিরডাপে (সেন্টার অব ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আলোচনায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ এ মন্তব্য করেন।
কামাল আহমেদ বলেন, আমরা যেই সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন সরকারকে দিয়েছিলাম, তার কয়েক মাস পরে আমি এখন যেখানে চাকরি করি, সেটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সেখানে ২৮ জন সাংবাদিককে পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে একজনকে যখন বের করে আনা হয়, তখন তাকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়, মারধরের চেষ্টা করা হয়, সেখান থেকে অনুমান করা যায় যে, বাকি ২৭ জনের কেউ যদি আগে বের হয়ে আসতে পারত, তারা আদৌ বেঁচে থাকতেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
তিনি আরও বলেন, পাঁচ মাস আগে তথ্য উপদেষ্টা বললেন যে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন পাস করে যাবেন, সেটা তিনি করতে পারেননি, পারলে হয়তো এরকম কিছু ঘটত না। আমাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আজকে প্রায় ১০ মাসের বেশি হয়ে গেল, এতদিন যেসব সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ হয়েছে, হেনস্তা হয়েছে, তার সব দায় এই সরকারের। এখন কিছু ইউটিউবার উস্কানি দেন, যারা নগ্নতা এবং যৌনতা প্রচার করতেন, এখন তারা দেশপ্রেমের, ধর্মের, ভারতবিরোধিতার ঝাণ্ডা উড়াচ্ছেন। আজকে লজ্জা থাকলে এদের বেডরুম থেকে বের হওয়ার কথা না। গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা সরকারের পক্ষ থেকে নেই, কিন্তু মবের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে, আর এই মবকে প্রশ্রয় দিয়েছে এই সরকার, দায় এই সরকারের। সাংবাদিকতা আর মতপ্রকাশের মধ্যে তফাত আছে, এটা বুঝতে হবে, রাজনৈতিক মতামতও সংবাদপত্রে থাকবে, কিন্তু সংবাদের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠটা থাকতে হবে।
কামাল আহমেদ বলেন, আপনি টেলিভিশনের টকশোকে সংবাদপত্রের সংবাদের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন না। গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমরা জানতাম আমলাতন্ত্রের মধ্য দিয়ে আমাদের সুপারিশের বিরোধিতা আসবে, সেজন্য আমরা আইনের খসড়া করে দিয়েছি। প্রথমে আসলেন নাহিদ, সে মন্ত্রণালয়ের কাজ করার থেকে নিজের দল তৈরি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মাহফুজ যখন কাজ করার চেষ্টা করলেন তখন আমলাতন্ত্র তাকে কাজ করতে দিল না, এখানেও সরকারের ব্যর্থতা আছে, মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের বদলে দেওয়া যেত, কিন্তু সেটা করার কোনো চেষ্টাও করা হয়নি। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক থেকে আয়কর মওকুফ করার কথা আমরা বলেছিলাম, এটা করা খুবই সহজেই করা যেত কিন্তু করা হয়নি। আমরা কসমেটিক চেইঞ্জ চাই না, আমরা স্থায়ী পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এটি সাংবাদিকতার ওপর একটি বড় আঘাত।
আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বুঝতে হবে প্রতিবেদন লেখার সময় কার কথা উল্লেখ করতে হবে। প্রধান বক্তার কথা না লিখে অন্য কারও কথা লিখলে হবে না। এই এক মাসে কমিশনের কিছু বাস্তবায়ন হবে না। তড়িঘড়ি করে কিছু একটা করা হবে কিন্তু ওইটা ভালো হবে না। আমাদের উচিত রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে তারা কী বলছে তা পর্যবেক্ষণ করা। আরেকটি হলো সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে কিছু করা যায় কি না। ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা না থাকলে সাংবাদিক হওয়া যাবে না। আমি শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলছি না। তার প্রশিক্ষণ কতটুকু আছে, তা দেখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ মডিউল বলে দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণের পরে তাকে সার্টিফিকেট দেওয়া যেতে পারে। নারী সাংবাদিকদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অঞ্চল ভিত্তিকভাবে নারী সাংবাদিকদের অবস্থা খুবই করুণ। এই সরকারের সময় এটি বাড়ে নাই। এটি নিয়ে একটি প্রস্তাবনা হতে পারে যে, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে নারী সাংবাদিক নিয়ে কাজ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিক বা মামলায় আক্রান্ত সাংবাদিকদের ওপর রিভিউ করা যায় কি না। মামলা-মোকদ্দমা যা আছে, তা নিয়ে একটি রিভিউ এই সরকার দিয়ে যেতে পারে।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কাজী জেসিন বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের যা আশা ছিল তা অনেকটাই হয় নাই। ৫ আগস্টের পরে নতুন যা দেখা দিয়েছে যে অনলাইন মবের সৃষ্টি হয়েছে। এতে নতুন যারা মিডিয়াতে আসবে, তারা সাহস পাবে না আসার জন্য। সাংবাদিকদের সবাইকে একত্র হয়ে এটা থামাতে হবে। বর্তমানে আমাদের কোনো অগ্রগতি হয় নাই। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, প্রথম ৪ মাস সে কোনো কাজ করতে পারে নাই। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই এই সরকাকে যে, গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট কী-এটাই যে আপানারা নিজেরা ঘোষণা দিলেন জুলাইয়ের মাস্টারমাইন্ডকে নিয়ে এসে ৪ মাস বসিয়ে রাখলেন? নিজেদের মধ্যে যদি গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে, তাহলে আপনারা কী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন? উপদেষ্টা পরিষদে যদি ফ্যাসিজম থাকে, তাহলে আপনারা কোন ফ্যাসিজম বন্ধ করবেন?
এছাড়া আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, জি-৯- এর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, এনএইচকে টিভি-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি পারভীন এফ চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, ইরাবতীর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মো. মুক্তাদির রশীদ, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কাজী জেসিন, বিএনপির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডিইউজেএ) প্রাক্তন সহসভাপতি মীর আরশাদুল হক প্রমুখ।
