Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 1:05 pm

গভীর সমুদ্রে বিরল খনিজ উত্তোলনের উদ্যোগ জাপানের

শেয়ার বিজ ডেস্ক : চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে গভীর সমুদ্রে বিরল খনিজ উত্তোলনের লক্ষ্যে গতকাল সোমবার এক ঐতিহাসিক অভিযানে যাত্রা শুরু করেছে জাপানের একটি গবেষণা জাহাজ।

বৈজ্ঞানিক খনন জাহাজ ‘চিকিউ’ স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় শিজুওকার শিমিজু বন্দর ত্যাগ করে প্রশান্ত মহাসাগরের দূরবর্তী দ্বীপ মিনামি তোরিশিমার উদ্দেশে রওনা দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, দ্বীপটির আশপাশের জলসীমায় বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ রয়েছে। টোকিও থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

এই পরীক্ষামূলক অভিযানটি এমন এক সময়ে শুরু হলো, যখন জাপানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ সরবরাহকারী চীন। গত নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানে হামলা হলে সামরিক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকেই টানাপোড়েন তীব্র হয়।

চীন স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে।

বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বিরল খনিজে নিজের আধিপত্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধেও এই খাতটি চীনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে একদিন দেরিতে শুরু হওয়া ‘চিকিউ’-এর এই যাত্রা ভবিষ্যতে দেশে বিরল খনিজ উৎপাদনের পথ খুলে দিতে পারে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ দপ্তরের কর্মসূচি পরিচালক শোইচি ইশি।

বন্দরেই সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার কথা ভাবছি এবং নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে চাইছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিরল খনিজের দেশীয় উৎপাদন নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

বিরল খনিজ বলতে পৃথিবীর ভূত্বক থেকে উত্তোলনে জটিল ১৭ ধরনের ধাতুকে বোঝায়। এগুলো বৈদ্যুতিক যান, হার্ড ড্রাইভ, বায়ু টারবাইন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহূত হয়।

জাপান এজেন্সি ফর মেরিন-আর্থ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (জ্যামস্টেক) জানিয়েছে, ৬ হাজার মিটার গভীরতায় এ ধরনের পরীক্ষামূলক খনন বিশ্বে এই প্রথম।

জাপানের অর্থনৈতিক জলসীমায় অবস্থিত মিনামি তোরিশিমার আশপাশে ১ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি বিরল খনিজ মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিক্কেই বিজনেস ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম মজুত।

নিক্কেই জানিয়েছে, এই সমৃদ্ধ স্তরে রয়েছে প্রায় ৭৩০ বছরের জন্য প্রয়োজনীয় ডিসপ্রোসিয়াম, যা মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উচ্চক্ষমতার চুম্বকে ব্যবহূত হয়। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৭৮০ বছরের জন্য প্রয়োজনীয় ইট্রিয়াম, যা লেজার প্রযুক্তিতে ব্যবহূত হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর গবেষণা সহযোগী তাকাহিরো কামিসুনা এএফপিকে বলেন, ‘মিনামি তোরিশিমার আশপাশে যদি জাপান নিয়মিতভাবে বিরল খনিজ উত্তোলনে সফল হয়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতের জন্য একটি নিরাপদ দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘এতে তাকাইচি সরকারের জন্য এটি একটি বড় কৌশলগত সম্পদে পরিণত হবে ও চীনের ওপর সরবরাহ নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।’

এই গবেষণা অভিযান চলবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে দুই মাস ধরে চলা উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বেইজিং জাপানি পণ্য আমদানিতে বিলম্ব ঘটাচ্ছে ও টোকিওতে বিরল খনিজ রফতানির গতিও শ্লথ হয়েছে।

চলতি মাসে চীন জাপানের কাছে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ কিছু পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করেছে, যেগুলোর সামরিক ব্যবহার সম্ভব। এতে বেইজিং বিরল খনিজ সরবরাহও আটকে দিতে পারার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে জাপানের, কারণ এর কিছু চীনের দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।