Print Date & Time : 15 May 2026 Friday 12:07 am

গাজীপুর জেলা পরিষদে ‘কর্মচারীদের দুর্নীতির বলয়’

রিনার ৮ তলা বাড়ি, প্লাবনের ফ্ল্যাট, রেজওয়ানুলের রিসোর্ট, আল-আমিন

ও রফিকের একাধিক সম্পত্তি নিয়ে তোলপাড়

প্রতিনিধি, গাজীপুর : গাজীপুর জেলা পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেটকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। প্রশাসনিক সূত্র ও একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে, যাদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার কার্যক্রম, জমি লিজ বন্দোবস্ত এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে।

সাম্প্রতিক বদলি এবং সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটের খবরে সেই বলয়ে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্র প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে নিয়মিত আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও এই বলয়ের অঘোষিত প্রভাব ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি জেলা পরিষদের ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। একই সঙ্গে আর্থিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটের আলোচনা শুরু হতেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

অভিযোগ উঠেছে, বদলিকৃতদের একটি অংশ বর্তমানে জেলা পরিষদের সিইও নজরুল ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানামুখী অপতৎপরতায় জড়িয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন প্রায় ৩৪ বছর একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে, কাপাসিয়ায় জমি, গাজীপুরে বহুতল ভবন এবং রাজধানীর উত্তরায় ফ্ল্যাট রয়েছে তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। বদলির আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে রিট আবেদন করেছেন বলেও জানা গেছে।

শর্টলিপিকার প্লাবন আলী প্রায় ১৭ বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুরের ছায়াবীথি এলাকায় তার ফ্ল্যাট এবং শেরপুরে বাগানবাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

সার্ভেয়ার রেজওয়ানুল হকের বিরুদ্ধে জমি লিজ বন্দোবস্তে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গাজীপুর শহরের হায়দ্রাবাদ এলাকায় ‘অঙ্গনা’ নামে একটি রিসোর্ট, টঙ্গীতে পাঁচতলা বাড়ি এবং দক্ষিণ ছায়াবীথিতে ফ্ল্যাট রয়েছে তার। সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জেলা পরিষদের বর্তমান কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও রয়েছে আয়বহির্ভূত সম্পদ গড়ার অভিযোগ।

নিম্নমান সহকারী রিনা আক্তার প্রায় ২৫ বছর ধরে একই পরিষদে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি গাজীপুর শহরের রাজদীঘির পশ্চিম পাশে ৮ তলা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।

উচ্চমান সহকারী আল আমিন প্রায় ১৪ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ উঠেছে, গাজীপুর শহরের দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকায় তার একাধিক সম্পত্তি রয়েছে এবং কথিত সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জড়িত তিনি।

রফিকুল ইসলাম রফিকের বিরুদ্ধেও গাজীপুর শহরে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও আয়বহির্ভূত সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া উপসহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন, নিম্নমান সহকারী হারুন অর রশিদ, পিয়ন সোনিয়া আক্তার এবং ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে।

জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এই বলয়ের বাইরে থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল। টেন্ডার বণ্টন, জমি লিজ, প্রকল্প অনুমোদন এবং ঠিকাদার নির্বাচন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের প্রভাব ছিল দৃশ্যমান।

অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের কমিশন লেনদেন হতো এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে আর্থিক অনিয়ম ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় জমি, বাগানবাড়ি ও বহুতল ভবন গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, প্রশাসনিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে জেলা পরিষদের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, ফরেনসিক অডিট ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণেই দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী চক্র এখন চাপে পড়েছে।

জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী জানান, ফরেনসিক অডিটের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো অনিয়মকারীই আইনের বাইরে থাকতে পারবে না। জেলা পরিষদকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু বদলি নয়-গাজীপুর জেলা পরিষদের বিগত দুই দশকের আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার কার্যক্রম, জমি লিজ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ছাড়া প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না বলেও মনে করছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী বলয়ের আধিপত্য-এই তিন কারণেই গাজীপুর জেলা পরিষদে দুর্নীতির অভিযোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের চলমান পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে কি না, নাকি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপেই আবারও থেমে যায় তদন্ত প্রক্রিয়া।