ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ : মশা তাড়ানোর জন্য সবচেয়ে সহজ ও স্বস্তা উপায় হিসেবে অনেকেই কয়েল ব্যবহার করে থাকেন। মশার কামড়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জাপানিজ এনকেফালাইটিস, বার্মা ফরেস্ট ফিভার ও টুলারোমিয়ার (স্বল্পমাত্রায় আক্রান্ত হয়) মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিশেষ করে প্রতিবছর মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ খুব বেশি দেখা যায়। সাম্প্রতিক দেশে ‘এডিস’ মশার কারণে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় এক লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে বয়স্ক ও শিশুসহ ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন, তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মশার কামড় থেকে যে রোগগুলো হয় তার ধারণা আমাদের থাকলেও মশার কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে শরীরের কী কী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে তা অনেকেরই অজানা।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মশার কয়েলে যে পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মাত্রায় (দশমিক শূন্য ১ থেকে সর্বোচ্চ দশমিক শূন্য ৩ মাত্রার) থাকার কথা। তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা অননুমোদিত কয়েল ফ্যাক্টরি সেই মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকে; যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব কয়েলের ধোঁয়ায় মশা, তেলাপোকাসহ কীটপতঙ্গ মারা পড়ছে। অথচ কয়েল কোম্পানিগুলো মোড়কে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রারই উল্লেখ রয়েছে। এসব কয়েল ব্যবহারের ফলে শ্বাসনালিতে ক্যান্সার, অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিসসহ বিকলাঙ্গতার মতো ভয়াবহ রোগ এমনকি গর্ভের শিশুও আক্রান্ত হতে পারে। মশার কয়েলে ব্যবহƒত বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়। সেগুলোই আমাদের নাকে ঢোকে। কয়েলে থাকা কিছু রাসায়নিক পদার্থ ত্বকের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো আক্রান্তদের লিভার-কিডনি বিকল হওয়া, ত্বকে চুলকানি, অ্যালার্জিসহ নানা চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। তবে নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে।
মশার কয়েলের প্রধান উপাদান হিসেবে থাকে পাইরোফ্রয়েড। এটি প্রাকৃতিক যৌগ পাইরোগ্রাম থেকে পাওয়া যায়। এর আসল সক্রিয় উপাদানটি হলো কীটনাশক ডিডিটি বা পিন্ডেনের মতো ক্লোরিনেটেড হাইড্রোকার্বন, প্যারাফিনের মতো আরপ্যান ফসফরাস যৌগ ও কার্বন।
গবেষণা থেকে জানা যায়, একটি মশার কয়েল যে পরিমাণ ধোঁয়া উৎপন্ন করে তা ১০০টি সিগারেটের ধোঁয়ার সমান। এর ফলে অনেক রকম স্নায়ুঘটিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, মশার কয়েলের মারাত্মক রাসায়নিক উপাদান মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতাও হ্রাস করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আদনান ইউসুফ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, মশার কয়েলের ধোঁয়া থেকে নিম্নোক্ত শারীরিক সমস্যাগুলো বেশি হতে পারে।
শ্বাসকষ্টের সমস্যা
মশা তাড়ানোর কয়েল জ্বালালে যে ধোঁয়া হয় তা থেকে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। এছাড়া নাক জ্বালা-পোড়া, গলাব্যথা, কাশির মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। যাদের অ্যালার্জি ও অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে অথবা ঠান্ডার সমস্যা রয়েছে তাদের অবশ্যই মশা তাড়ানোর কয়েল থেকে দূরে থাকতে হবে। কয়েলের ধোঁয়া ফুসফুসের ওপরেও প্রভাব ফেলে। ফলে প্রাথমিকভাবে কাশির সমস্যার পাশাপাশি পরবর্তীকালে বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। মশা তাড়ানোর কয়েলে কারসিনোজিনস নামক উপাদানের উপস্থিতির কারণে ফুসফুসের বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।
সেনসিটিভ স্কিনে হতে পারে সমস্যা
যাদের ত্বক খুব সেনসিটিভ তাদের ক্ষেত্রে মশা তাড়ানোর কয়েল থেকে ত্বকে অ্যালার্জি, র্যাশ, চুলকানি, লালভাব ইত্যাদি অস্বস্তিকর সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন ভারীধাতব অর্থাৎ হেভি মেটাল-জাত উপকরণ থাকে কয়েলের মধ্যে। এই তালিকায় রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম, ক্রোমিয়াম। এসব ধাতব উপকরণ ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত মাথাব্যথা
যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা আছে তাদের ঘরে মশার কয়েল না রাখাই ভালো। বিশেষ করে খুব অল্পেই যাদের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায় তারা মশা তাড়ানোর কয়েলের ধোঁয়া, গন্ধ কিছুই সহ্য করতে পারেন না। আর এই গন্ধ খুবই তীব্র হয়। অতএব সাবধানে থাকুন। এমনিতেও ঘরে কয়েল জ্বালানো থাকলে ওই তীব্র গন্ধ ও ধোঁয়ায় একটা দম বন্ধ করা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। বাড়িতে বাচ্চা এবং বয়স্ক মানুষ থাকলে কয়েল থেকে তাদের অবশ্যই দূরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কয়েলে ব্যবহার কমিয়ে মশারি, প্রাকৃতিক তেল বা বৈদ্যুতিক মশা তাড়ানোর যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত মার্চ-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মশার উপদ্রোপ বেশি হয়ে থাকে। এ সময় সিটি করপোরেশনগুলোকে মশক নিধনে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটানো, জনসাধারণকে আরও সচেতন করতে হবে। যাতে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র যেমন, গাড়ির টায়ার, ডাবে খোসা, বদ্ধ জলাশয়ে কোনোভাবেই পানি জমে এডিট মশা বংশ বৃদ্ধি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
