সৌরভ রাজবংশী : বাংলাদেশে ঘোড়ায় চড়া (হর্স রাইডিং বা ইকুয়েস্ট্রিয়ান স্পোর্টস) শুনলেই অনেকের চোখে এটা ‘শখ’ বা ‘রাজকীয় বিলাস’ হিসেবে ধরা পড়ে। অথচ বিশ্বজুড়ে ইকুয়েস্ট্রিয়ান ইন্ডাস্ট্রি এখন শুধু খেলা নয়; এটা স্পোর্টস, ট্যুরিজম, ভেটেরিনারি সার্ভিস, ট্রেনিং, সেফটি গিয়ার, স্টেবল ম্যানেজমেন্ট, ফিড-সাপ্লাই, ইভেন্ট-একটা পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম।
আমি নিজে বাংলাদেশে গত আড়াই বছর ধরে ঘোড়ায় চড়া শিখছি ও চর্চা করছি। সত্যি কথা বলতে, শুরুতে মনে হয়েছিল-সময় দিলেই শিখে ফেলব। কিন্তু দুই বছর পার হতেই বুঝলাম, এখানে শুধু ‘শেখা’ নয়, বিশাল এক যাত্রাপথ। অনেক সময় একাই লড়তে হয় পুরো সিস্টেমের ঘাটতির সঙ্গে। প্রশিক্ষক নেই বা পর্যাপ্ত নয়, ভালো ভেট নেই, স্টেবল স্ট্যান্ডার্ড নেই, সেফটি কালচার দুর্বল-এসব বাধা পেরিয়ে টিকে থাকাটাই একটা অর্জন।
এই লেখায় আমি তিনটা বিষয় একসঙ্গে ধরার চেষ্টা করেছি-এক. বাংলাদেশে ঘোড়ায় চড়ার বর্তমান বাস্তবতা ও বাধা। দুই. সম্ভাবনা-এখানে কীভাবে এই সেক্টর দাঁড়াতে পারে। তিন. বিশ্ববাজার কীভাবে কাজ করে, আর বাংলাদেশ কোথায় সুযোগ নিতে পারে।
বাংলাদেশে ঘোড়ায় চড়া: বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে ঘোড়া আছে গ্রামে, বিয়ে/শোভাযাত্রা/কাজে, কিছু জায়গায় প্রজনন ও ব্যবসায় এবং রাইডিং স্কুলে। কিন্তু স্পোর্টস বা সিস্টেমেটিক রাইডিং কালচার খুবই নতুন ও সীমিত।
যে সমস্যাগুলো আমি নিজের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি দেখেছি-
প্রশিক্ষকের সংকট: দক্ষ ইন্সট্রাক্টর, বিশেষ করে ইংরেজি স্টাইল বা সঠিক বেসিক শেখানোর লোক কম।
ভেটেরিনারি সাপোর্ট দুর্বল: ঘোড়ার জন্য স্পেশালাইজড ইকুয়াইন ভেট, hoof care (farrier নিয়মিত পাওয়া যায় না বা নেই বললেই চলে।
সেফটি কালচার কম: হেলমেট/রাইডিং বুট/চ্যাপস, সেফটি গিয়ার-এগুলোকে অনেক জায়গায় জরুরি হিসেবে দেখা হয় না।
হর্স ওয়েলফেয়ার ও ম্যানেজমেন্ট গ্যাপ: সঠিক খাদ্য, নিয়মিত পরিচর্যা, টিকা/ভ্যাকসিন, স্টেবল হাইজিন, ট্রেনিং লোড ম্যানেজমেন্ট স্ট্যান্ডার্ডাইজড নয়। ইনফ্রাস্ট্রাকচার সীমিত: ভালো এরিনা, সঠিক গ্রাউন্ড, রুটিন ট্রেনিং স্পেস, স্যাডেল-ফিটিং সার্ভিস-এসবের সংখ্যা একেবারেই কম।
কস্ট/অ্যাক্সেস সমস্যা: ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল। আবার নিরাপদ জায়গা/ঘোড়া পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেকের পক্ষে নিয়মিত প্র্যাকটিস সম্ভব হয় না।
এগুলো শুধু ‘আমার সমস্যা’ নয়, এগুলো আসলে বলে দেয়, বাংলাদেশে ঘোড়ায় চড়া এখনো একটা স্টেজে আছে: ‘শখ থেকে ইন্ডাস্ট্রি’ হওয়ার মাঝখানে।
তারপরও সম্ভাবনা কেন বিশাল?
যে দেশে ট্রাফিক, স্ট্রেস, স্ক্রিন-লাইফ বাড়ছে, সেখানে ‘আউটডোর থেরাপি’ হিসেবে ঘোড়ার সঙ্গে কাজ করার চাহিদা বাড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে এই কারণে ইকুয়েস্ট্রিয়ান সেক্টরে নতুন ট্রেন্ড এসেছেÑ
ইকুয়েস্ট্রিয়ান ট্যুরিজম ও অভিজ্ঞতা
অনেকে প্রতিযোগিতা নয়, ‘হর্স রাইডিং এক্সপেরিয়েন্স’ খোঁজে-গ্রামীণ ট্রেইল, নদীর ধারে রাইড, রিসোর্টভিত্তিক রাইডিং। বাংলাদেশে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-সিলেট-গাজীপুর-সাভার-রাজশাহীÑএ ধরনের জায়গায় পরিকল্পিতভাবে করলে ট্যুরিজম-ফোকাসড রাইডিং দাঁড়াতে পারে।
ফিটনেসের জন্য রাইডিং ও মানসিক স্বাস্থ্য
ঘোড়ায় চড়া শুধু পা-হাতের কাজ নয়, এটা posture, core strength, balance, focus-সবকিছু। অনেক দেশে এটি anxiety/stress কমানোর সহায়ক অ্যাক্টিভিটি হিসেবে জনপ্রিয়। বাংলাদেশে ‘ফিটনেস’-এর ধারণা বদলাচ্ছে। সাইক্লিং, হাইকিং জনপ্রিয় হচ্ছে এবং রাইডিংও জায়গা নিতে পারে।
নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ
ইকুয়েস্ট্রিয়ান স্পোর্টসের একটা সুন্দর দিক হলো অনেক ডিসিপ্লিনে নারী-পুরুষ একই প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা করে। বাংলাদেশে যদি নিরাপদ পরিবেশ ও প্রশিক্ষণ তৈরি হয়, নারীর অংশগ্রহণ খুব বড় সম্ভাবনা।
বিশ্ব ইকুয়েস্ট্রিয়ান বাজার: বাজারটা আসলে কী দিয়ে দাঁড়িয়ে?
বিশ্বে ইকুয়েস্ট্রিয়ান ইন্ডাস্ট্রি সাধারণত কয়েকটা বড় অংশে বিভক্ত-
ঘোড়া পালন, প্রজনন, ক্রয়-বিক্রয় ইন্সট্রাক্টর, ট্রেনিং সেন্টার ভেট, ফারিয়ার, ডেন্টাল, ফিজিও, ইনস্যুরেন্স
স্যাডেল, ব্রাইডল, হেলমেট, বুট, গ্লাভস, জ্যাকেট, কেয়ার প্রোডাক্ট শো, জাম্পিং, রেসিং, ডারেশনভিত্তিক ইভেন্ট রিসোর্ট/ট্রেইল রাইডিং বিশ্বব্যাপী ঘোড়াশিল্পের বাজার বিশাল এবং বহুমুখী, যার মধ্যে শুধু ঘোড়া কেনাবেচা নয়, বরং ঘোড়দৌড়, সরঞ্জাম, পরিচর্যা, ইভেন্ট ও পর্যটন অন্তর্ভুক্ত; ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক ইকুয়েস্ট্রিয়ান বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি (সূত্র- newstyledigital.com -১৮/০৩/২৪) এবং শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘোড়াশিল্পের অর্থনৈতিক প্রভাব ১৭৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি খেলাধুলা, বিনোদন, সরঞ্জাম ও খাদ্য খাতকে ঘিরে বিস্তৃত, যেখানে দামি ঘোড়া যেমন ৭০ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি দামে বিক্রি হয়, তেমনই প্রশিক্ষিত ও প্রজননের ঘোড়া বিশাল অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখে।
* ঘোড়দৌড় বাজার (Horse Racing Market): ২০২৪ সালে এর মূল্য ছিল প্রায় ৪০০ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে ।
* মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব: এখানে ঘোড়াশিল্পের মোট অর্থনৈতিক প্রভাব ১৭৭ বিলিয়ন ডলার।
* ইউরোপীয় প্রভাব: যুক্তরাজ্যে এই শিল্পে বার্ষিক প্রায় পাঁচ বিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখে।
( সূত্র- zionmarketresearch.com)
বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক ট্রেন্ডগুলো (যা বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলতে পারে)
* সেফটি-ফার্স্ট গিয়ার: উন্নত হেলমেট, বুট, ভেস্ট ইত্যাদি
* ঘোড়ার ওয়েলফেয়ার স্ট্যান্ডার্ড: ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি, স্টেবল কন্ডিশন, কেয়ার
* ট্রেনিং ও কমিউনিটি: ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড কোচিং, অ্যানালাইসিস এবং কমিউনিটি বিল্ডিং
* অ্যাক্সেসিবল রাইডিং: নতুনদের জন্য রাইডিং স্কুল ও অন্যান্য সুবিধা
বাংলাদেশের সুযোগ কোথায়? আমার মতে, আমরা শুরুতে বড় কম্পিটিশন মার্কেট নয়, বরং রাইডিং স্কুল + সেফটি + ওয়েলফেয়ার + ট্যুরিজম এক্সপেরিয়েন্স-এই চারটা একসঙ্গে ধরলে দ্রুত গ্রোথ সম্ভব।
৪. বাংলাদেশের ‘অবস্ট্র্যাকল’
আমি যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছি, ইন্সট্রাক্টর নেই, ভেট নেই-এগুলোই আসলে বাজারের ‘গ্যাপ’। গ্যাপ মানে সুযোগ।
৫. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: ‘আমি ২ বছর ধরে লড়ছি’-এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে নতুন কোনো স্পোর্ট বা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠতে গেলে সাধারণত প্রথম কয়েক বছর কাটে একাকী সংগ্রামে। যারা আগে শুরু করে, তারা শুধু শেখে না, তারা অজান্তেই ‘পাথফাইন্ডার’ হয়ে যায়।
আপনি বলছেন, আপনি দুই বছর ধরে সংগ্রাম করছেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ-
* আপনি বাস্তব বাধাগুলো চোখে দেখেছেন
* আপনি জানেন কোনটা কাজ করে, কোনটা করে না
* আপনি চাইলে আপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুনদের জন্য পথ সহজ করতে পারেন
বাংলাদেশে ঘোড়ায় চড়া নতুন, তাই সম্ভাবনাও নতুন
বাংলাদেশে ইকুয়েস্ট্রিয়ান কালচার এখনো শুরুর পর্যায়ে। বাধা আছে, সংকট আছে, কিন্তু ঠিক এই কারণেই সম্ভাবনা অনেক। সঠিক ট্রেনিং, সেফটি, ওয়েলফেয়ার এবং সার্ভিস-ইকোসিস্টেম তৈরি হলে ঘোড়ায় চড়া বাংলাদেশে একটি সম্মানজনক স্পোর্টস + লাইফস্টাইল + ট্যুরিজম সেক্টর হতে পারে।
আমি নিজে আড়াই বছর ধরে এই পথেই আছি অনেক বাধা পেরিয়ে। বিশ্বাস করি, এই নতুন পথটা যদি আমরা সঠিকভাবে গড়ি, তাহলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশেও ঘোড়ায় চড়া আর ‘অচেনা’ থাকবে না, বরং ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠবে।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post