Print Date & Time : 16 May 2026 Saturday 2:47 am

চট্টগ্রামের চামড়াশিল্পে ধস

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম: একসময়কার সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও যে অঞ্চলে ২২টি ট্যানারি দাপটের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করত, সেখানে আজ টিকে আছে মাত্র একটি। অর্থসংকট, বাজার কাঠামোর পরিবর্তন, বকেয়া অর্থ আটকে থাকা এবং কমপ্লায়েন্স জটিলতা, পাশাপাশি ঢাকাকেন্দ্রিক ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দীর্ঘদিনের পৈতৃক ব্যবসা ছেড়ে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে চট্টগ্রামের শত শত আড়তদার।
পাকিস্তান আমল থেকে গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প স্বাধীনতার পরও দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সময়ের ধারাবাহিকতায় একে একে ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে কার্যক্রম চালু আছে কেবল রিফ লেদার ট্যানারি। ব্যবসায়ীদের মতে, কাঠামোগত পরিবর্তন, বাজার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র ঢাকায় স্থানান্তর এবং নীতিগত ভারসাম্যহীনতার কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, কোরবানির আগে সরকার যে দর নির্ধারণ করে, বাস্তবে সেই দরে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হয় না। কোরবানির পর ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রির সময় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। এতে প্রতি মৌসুমেই বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে আড়তদারদের। তাদের দাবি, ঘোষিত মূল্য আর বাজার মূল্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হওয়ায় পুরো খাতেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের বকেয়া আটকে আছে বলেও অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় অনেক আড়তদার মূলধন হারিয়ে দেনা-দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একটি ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, একসময় যেখানে ১৪০ থেকে ১৫০ জন আড়তদার সক্রিয় ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জনে। ধারাবাহিক লোকসান, বাজার অনিশ্চয়তা এবং পুঁজি সংকটের কারণে বহু ব্যবসায়ী পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
তারা জানান, চামড়া বাজার এখন কার্যত ঢাকাকেন্দ্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। কোরবানির মৌসুমে চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ চামড়া ঢাকায় পাঠাতে হয়। এতে স্থানীয় বাজারে দর ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন আড়তদাররা। তারা মনে করেন, এই কেন্দ্রীয় নির্ভরতা কমানো না গেলে চট্টগ্রামের বাজার আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে না।
চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ট্যানারি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কার্যক্রম চালু রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বন্ধ ট্যানারিগুলো আবার চালুর উদ্যোগ না থাকায় শিল্পটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কমপ্লায়েন্স সংকট। এলডব্লিউজি সনদ ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ছে। লাম্পি, অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগের কারণে পশুর চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়াও আরেকটি বড় সমস্যা। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চামড়াশিল্প। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ, টিকা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম চামড়া আড়তদার সমিতির সহসভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া না পাওয়া পর্যন্ত চামড়া কেনার সক্ষমতা সংকটে থাকবে। তিনি বলেন, একটি চামড়া কিনতে যেখানে ৪০০ টাকা খরচ হয়, সংরক্ষণ ও পরিবহন মিলিয়ে আরও প্রায় ৪০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। দীর্ঘ পথ পরিবহন ও যানজটের কারণে অনেক সময় চামড়া পচে যায়। সরকারি খাস জায়গা যেমন আমিন জুট মিলস ও কটন মিলস এলাকায় কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে চামড়া সংরক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
চট্টগ্রামের অন্যতম পুরোনো ও পরিচিত ট্যানারি মদিনা ট্যানারি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে পরিবেশগত জটিলতার কারণে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হাজি আবু মোহাম্মদ জানান, একসময় আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, জাপান ও কোরিয়াসহ বহু দেশে চামড়া রপ্তানি হতো। তবে পরিবেশ দূষণের নামে নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নগত দুর্বলতার কারণে চামড়াশিল্প আজ গভীর সংকটে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে বর্তমানে টিকে থাকা রিফ লেদার ট্যানারি তুলনামূলকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। টি কে গ্রুপের সহযোগী এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালে কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়। এলডব্লিউজি সনদ থাকায় এটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতে পারছে।
রিফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান জানান, এলডব্লিউজি সনদ ছাড়া ইউরোপের ক্রেতারা চামড়া বা চামড়াজাত পণ্য কেনে না। সনদ থাকায় তারা প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন, যেখানে অন্যরা তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী-আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামে বন্ধ হওয়া ট্যানারিগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে। ব্যবসায়ীদের মতে, নীতি-সমন্বয়, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, বকেয়া আদায়, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ট্যানারি পুনরুজ্জীবন ছাড়া চট্টগ্রামের চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।