নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলছে ইরানের যুদ্ধ। মাসব্যাপী চলা এই সংঘাত ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়েও, যেখান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি। এমন অবস্থায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বে নজিরবিহীনভাবে তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকট। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও প্রকট আকার ধারণ করেছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন কমছে না। কোথাও কোথাও অকটেন ফুরিয়ে যাওয়ায় বিত্রিদ্ধ বন্ধ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে চালকদের। ডিজেলের সংকটে নৌযান চলাচলও কমে গেছে। শুধু এসব সংকটই নয়, দেশের শিল্পকারখানাও সৃ®ি¡ হয়েছে সংকট। ব্যহত হচ্ছে উৎপাদন। ঈদ-পরবর্তী সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে এই সংকটে বেশি পড়েছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি পোশাক খাতের জন্য কৌশলগত ডিজেল বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে দাবি করেছে পোশাক মালিকদের সংগঠনগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দর নগরীতে অন্তত ছয়টি কারখানা পরিচালনা করে শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি চালু রেখে উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তারা প্রতিদিন মাত্র ৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার লিটার ডিজেল পাচ্ছেন। আবার কখনো কখনো সেটাও পাচ্ছে না। এই ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় ভোগান্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। আমাদের ফ্যাক্টরি চালানোর জন্য যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, হ্যান্ডলিংয়ের যন্ত্রপাতি, পোর্ট থেকে মাল নামানোর গাড়ি-সবকিছু নিয়েই আমরা বেকায়দায় আছি। আমাদের দৈনিক তেল লাগে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ লিটার। সেখানে মঙ্গলবার তেল দিয়েছে মাত্র ৯ হাজার লিটার। কালকে দেবে কি না, সেটাও বুঝতে পারছি না। শনিবার ৯ হাজার লিটার পেয়েছি, রোববার তেল পাইনি, সোমবার ১৮ হাজার লিটার দিয়েছে। ফলে আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।
শুধু বিএসআরএমই নয়, ভারী যন্ত্রপাতি, যেমন ক্রেন, ফর্কলিফট, জেনারেটর ও এক্সকাভেটর চালাতে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানও একই ধরনের সংকটে পড়েছে।
শিল্পকারখানার মালিকেরা বলছেন, ঈদের লম্বা ছুটির পর শিল্পকারখানা পুরোদমে খুলেছে। ফলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে তেলের চাহিদা বেড়েছে। দ্রুত তেল সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি না হলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তাই তেল সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রয়োজনে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এশিয়ান গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, জ্বালানি সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অনেক গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎবিভ্রাটের জন্য জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত না হলে উৎপাদনশীলতা, সঠিক সময়ে উৎপাদন এবং রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন করা দুরূহ। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার সংকট সৃ®ি¡ বা অর্ডার বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে অনেক কারখানা আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। শ্রমিক পরিবহনের গাড়ি সরবরাহশেষ পৃষ্ঠার পর সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা কমে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটে রেশনিং বা সরবরাহ বিঘ্নিত-সামগ্রিক অর্থনৈতিতে সরাসরি নীতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই খাত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
ঈদের আগে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল পেতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সদস্য প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে তৈরি পোশাকশিলগু মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তবে সেটিও এখন কাজ করছে না। গত শনিবার সদস্য কারখানাগুলোকে তাদের জেনারেটরের ক্ষমতা এবং দিনে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে কত লিটার তেল লাগবে, তার একটি চাহিদাপত্র চেয়েছে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রামসহ দেশের পোশাকশিলগু প্রতিষ্ঠানগুলোতে এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে বলে তথ্য রয়েছে। আমাদের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যদি সাপ্লাই চেইনে কোনো ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, তা আমরা জানি না। অবৈধভাবে তেল মজুতের কারণেও বাজারে স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। ভিজিবিলিটি না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এর প্রায় পাঁচ শতাংশ ব্যবহƒত হয় শিল্পকারখানায়। ডিজেলের বড় অংশ ব্যবহƒত হয় পরিবহন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মূলত সৌদি আরব ও সংযুত্তদ্ধ আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসেনি। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। একইভাবে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। এই যুদ্ধের কারণে এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা পরিচালনায় ডিজেল ব্যবহƒত হয়। একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কারখানার বয়লার পরিচালনায় এলএনজি ব্যবহƒত হয়। বৈশ্বিক বাজারে এই দুই জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ায় দেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।
