Print Date & Time : 24 April 2026 Friday 8:51 pm

চট্টগ্রামে তীব্র জ্বালানি সংকট, সরবরাহ নেই বহু পাম্পে

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় চট্টগ্রাম নগরের পেট্রোল পাম্পগুলোয় রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন ক্রেতারা। অতিরিক্ত চাহিদা ও সরবরাহ সংকটের কারণে নগরের সব পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্প খোলা থাকলেও অতিরিক্ত তেল নেওয়া ঠেকাতে সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা এবং প্রাইভেট কারে ৫০০ টাকার বেশি পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। কাক্সিক্ষত পরিমাণে তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। তাদের অভিযোগ-দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে বন্দর নগরের পেট্রোল পাম্পগুলোয় মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। গতকাল শুক্রবারও একই চিত্র দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় চালকরা আগেভাগেই গাড়ির ট্যাংকি পূর্ণ করে নিচ্ছেন। রাইড শেয়ারিং চালক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক সবার মাঝেই কাজ করছে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও বিশ্ববাজারে তেলের দামে ওঠানামার কারণে দেশেও দাম বাড়বে-এমন আশঙ্কায় আগেভাগেই জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে রাখতে পেট্রোল পাম্পে ভিড় করার কথা জানিয়েছেন একাধিক ক্রেতা। যদিও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। তেলেরও পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে। ফলে ক্রেতাদের অধিক চাহিদার কারণে অনেক পাম্পে তেলের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে মোটরসাইকেল প্রতি ১০০ টাকার অধিক পেট্রোল বা অকটেন বিক্রি করছেন না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের হাটহাজারী সড়কের পাঁচলাইশ থানাধীন আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থিত এমআইভি সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টায় গিয়ে দেখা গেছে, পাম্পটিতে তেল দেওয়া বন্ধ রেখেছে। দুপাশে রশি টেনে যানবাহন প্রবেশ বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। পাম্পে কর্মরত শ্রমিক জানান, তেল ফুরিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তেল নেওয়ার জন্য গাড়ির চাপ বেশি ছিল। এ কারণে তেল শেষ। তেলের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আসার পর আবার তেল দেওয়া চালু হবে।

চট্টগ্রামের গণি বেকারির মোড় এলাকার অন্যতম ব্যস্ত কিউসি পেট্রোল পাম্পে পেট্রোল কিনতে আসা মোটরসাইকেল চালক রবিউল ইসলাম খোকন বলেন, আমি মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে যাতায়াত করব। কিন্তু আমাকে তেল দিল মাত্র ১০০ টাকার। যদি সংকট না থাকে, তাহলে এমন সীমাবদ্ধতা কেন, সেটাই বুঝতে পারছি না। আরেক মোটরসাইকেল চালক আলমগীর হোসেন বলেন, আমি ঢাকা যাব। গাড়ির তেল নেই। এখন পাম্পে এলাম তেল নিতে। কিন্তু ২০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। তাহলে ১৫০ কিলোমিটার পথ কীভাবে যাব? তেলের সংকট নেই। কিন্তু যুদ্ধের আতঙ্কে সবাই হুড়োহুড়ি করে তেল কিনছেন। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অনেকে।

এ বিষয়ে কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড পেট্রোল পাম্পের বিক্রয় প্রতিনিধি রাতুল দাস বলেন, গতকালই সবাই যার যার মতো করে অতিরিক্ত তেল নিয়ে স্টক করে ফেলায়, বাধ্য হয়ে আজকে আমাদের তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দিতে হয়েছে।

নাসিরাবাদের সেনা স্টেশন এলাকায় মোটরসাইকেলে তেল নিতে আসা সাইমন ও রনি বলেন, হঠাৎ করেই শোনা যাচ্ছে কাল থেকে নাকি তেল পাওয়া নাও যেতে পারে। এ খবর শুনে তড়িঘড়ি করে পাম্পে এলাম। সাধারণ সময়ে ট্যাংক পুরো ভর্তি না করলেও পরে তেল পাওয়া যাবে না-এই আশঙ্কায় আজ ট্যাংক ফুল করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ২০০ টাকার বেশি দেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাওয়ের প্রাইভেটকার চালক দৌলত খান বলেন, ‘তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে এসে শুনি তেল নেই। এভাবে চলতে থাকলে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তাহলে সংসার চালাব কীভাবে?’

বাদশা মিয়া অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেলে অকটেন নিতে আসা সিহাব উদ্দিন বলেন, আমি পাম্পে এক হাজার টাকার তেল নিতে এসেছিলাম, তারা আমাকে ১০০ টাকার দিয়েছে। এখন এই তেল দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারব কি না বলতে পারছি না। আরেক মোটরসাইকেল চালক কামাল হোসেন বলেন, পাম্পগুলো তেলের দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।

এস আইচ খান ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা আরেক চালক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি আধা ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখনো তেল পাইনি।

আরেক মোটরসাইকেল চালক হাবিব বলেন, আমি মোটরসাইকেল জরুরি কাজে ব্যবহার করি, ঘোরাফেরার জন্য নয়। নিয়ম করে প্রয়োজনমতো তেল ভরি। আজ তেল তুলতে এসে দেখি আজকের মতো তেল শেষ। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এই অবস্থা হয়েছে।

তেলের জন্য হুজুগে পরিস্থিতি তৈরি হলেও কোথাও বাড়তি দাম নেয়ার অভিযোগ মেলেনি। প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ এবং অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা করে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশে ব্যবহƒত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটের কারণে কখনো কখনো আমদানি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব দেখা দিলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিতভাবে তেল আমদানি করা হচ্ছে।

বিপিসি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ভোক্তার মধ্যে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অনেক ডিলারও  ডিপো থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। এমনকি কিছু ভোক্তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন বলেও তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে এক ট্রিপে জ্বালানি তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করেছে বিপিসি। নির্দেশনা অনুযায়ী মোটরসাইকেল প্রতি ট্রিপে সর্বোচ্চ দুই লিটার অকটেন বা পেট্রোল নেওয়া যাবে। প্রাইভেট কারে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ ১০ লিটার। এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল দেওয়া যাবে। ডিজেলচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ করা যাবে।

বিপিসি আরও জানিয়েছে, ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার সময় ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে রশিদ দিতে হবে। পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় আগের ক্রয়ের রশিদের মূল কপি জমা দিতে হবে।

এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোকে তাদের মজুত ও বিক্রি-সংক্রান্ত তথ্যসংশ্লিষ্ট ডিপোতে জানিয়ে তেল উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোও ডিলারদের সরবরাহ দেওয়ার আগে বরাদ্দ অনুযায়ী মজুত ও বিক্রয় তথ্য যাচাই করবে।