Print Date & Time : 21 May 2026 Thursday 12:42 am

চট্টগ্রাম থেকে বিপিসি কার্যালয় স্থানান্তরের পাঁয়তারা

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল আমদানিকারক ও পরিবেশক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগকে ঘিরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ‘ঢাকাপ্রীতি’ এবং একটি প্রভাবশালী মহলের তৎপরতায় সংস্থাটিকে কার্যত রাজধানীকেন্দ্রিক করার অপচেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা সুকৌশলে চট্টগ্রামে পদায়িত থাকা সত্ত্বেও দিনের পর দিন বছরের পর বছর ঢাকায় বসে লিয়াজোঁ অফিসের আড়ালে মূল দাপ্তরিক কাজ চালাচ্ছেন
স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
বর্তমানে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের সল্টগোলা রোডের বিএসসি ভবনে অবস্থিত । তবে বাস্তবে চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অধিকাংশ সময় কাটছে রাজধানী ঢাকায়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত বিপিসির লিয়াজোঁ অফিস থেকেই তারা মূল দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চট্টগ্রামে অবস্থিত প্রধান কার্যালয় কার্যত গুরুত্ব হারাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত একটি নোটিশ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত ৬ মে কুমিল্লা-৬ আসনের এমপি মো. মনিরুল হক চৌধুরী কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ ধারায় ‘জরুরি জন- গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে একটি মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১৯৯০ সালে তৎকালীন সরকার অযৌক্তিকভাবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তর করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নথিপত্র আদান-প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকায় ভাড়া করা ভবনে অফিস পরিচালনার কারণে সরকারের অর্থ অপচয় হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি ।
এই নোটিশের পরপরই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ও মনিটরিং-২ শাখা দ্রুত এ বিষয়ে মতামত চেয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠায়। পরে বিপিসির সচিব বিভিন্ন অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে মতামত দিতে নির্দেশ দেন। অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া এগোনোয় পর্দার আড়ালে একটি শক্তিশালী মহল সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপিসির মূল প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের চট্টগ্রামে অবস্থান করার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা দীর্ঘ সময় ঢাকায় অবস্থান করছেন। শেয়ার বিজের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, কিছু পরিচালক মাসের পর মাস চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হন না । কেউ কেউ কেবল আনুষ্ঠানিকতা রক্ষায় দু-এক দিনের জন্য এসে আবার ঢাকায় ফিরে যান। এর ফলে শুধু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই নয়, অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজেও স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। ব্যক্তিগত সহকারী ও বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ কাগজে- কলমে চট্টগ্রামে পদায়িত থাকলেও বাস্তবে তাদের অনেকেই ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে কাজ করছেন। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার যৌক্তিকতা খুবই দুর্বল। কারণ সংস্থাটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপারেশনাল কার্যক্রম চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশে আসে। পরে তা চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয় ।
এ ছাড়া বিপিসির অধীন প্রধান তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডসহ অধিকাংশ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মূল স্থাপনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অবস্থিত। বিদেশ থেকে আমদানি করা তেল প্রথমে এসব ডিপোতে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি চট্টগ্রামে অবস্থান না করেন, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম, তেল সরবরাহ, হিসাব ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি সম্ভব নয়।
বর্তমানে সরকার কক্সবাজারের মহেশখালী ও মাতারবাড়ী এলাকায় বড় বড় জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)’ প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও পতেঙ্গায় আধুনিক ট্যাংক টার্মিনাল ও এলপিজি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব মেগা প্রকল্পের তদারকি, জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ের জন্য বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের চট্টগ্রামে অবস্থান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা থেকে দূরবর্তীভাবে এসব প্রকল্প পরিচালনা করতে গেলে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এদিকে বিপিসির প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের উদ্যোগের বিরুদ্ধে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত ১৮ মে তাদের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবাদলিপি জমা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির অংশ হিসেবেই ১৯৯০ সালে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এখন সেটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গুরুত্বকে খর্ব করবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে। প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের এই যুগে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ঢাকায় অবস্থান করা জরুরি নয়। ই-নথি ব্যবস্থার মাধ্যমে
চট্টগ্রাম থেকেই দ্রুত সব ধরনের প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। তাই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দূরত্বের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবাদকারীরা বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের সপ্তাহে অন্তত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসকে সীমিত পরিসরে পরিচালনারও আহ্বান জানান তারা। সচেতন মহলের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং মাতারবাড়ী-পতেঙ্গার চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নের স্বার্থে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই রাখা উচিত। একই সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত সেখানে অবস্থান নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।