নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড ও ২২টি শ্রমিক সংগঠনের পরিচালনায় ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো শাটডাউনের ঘটনা ঘটেছিল দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামে। প্রায় দুই দশক পর আবারও সর্বাত্মক টানা শাটডাউন দেখল চট্টগ্রাম বন্দর। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত দুই সমন্বয়কসহ বন্দরের বিভিন্ন দপ্তরের ১৫ কর্মচারীকে খুলনার মোংলা বন্দর ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আন্দোলনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা দুজনও রয়েছেন। কিন্তু তারপরও দমানো যায়নি এই আন্দোলন।
এদিকে লাগাতার কর্মবিরতির সময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি কনটেইনার পণ্যও রপ্তানি হতে দেখা যায়নি। আন্দোলনকারীদের বাঁধার মুখে কোনো জাহাজ বন্দর জেটি ছেড়ে যেতে না পারায় হয়নি পণ্য রপ্তানিও। লাগাতার কর্মবিরতির কারণে পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় বন্দর চত্বর ও জেটিতে জাহাজের জট বাঁধে। এছাড়া বেসরকারি ডিপোতেও আটকে যায় রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের মূল্য আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। আন্দোলনের কারণে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। কদিন পর নির্বাচন, সামনে রমজানÑবেশ কিছু উপলক্ষে গার্মেন্টসহ শিল্প-কলকারখানায় থাকবে লম্বা ছুটি। সবমিলিয়ে বন্দর বন্ধ থাকায় অভাবনীয় বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। সব সংকটে হাঁসফাঁস সরকারও। তবে চট্টগ্রামে আসা নৌ-উপদেষ্টা এই নজিরবিহীন কর্মসূচিতে সৃষ্ট ‘ঘা’-এর ব্যথা আড়ালের চেষ্টা করে জানিয়েছেন, ‘এনসিটির জন্য বিদেশি চুক্তি হবেই’। কর্মসূচির কারণে ১৮ কোটি মানুষের সংকট না বুঝে কেউ ভোগান্তি সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপের পরিপ্রেক্ষিতে দুদিনের জন্য নিজেদের কর্মবিরতি স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তবে এই সময়ের মধ্যে সরকার ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত না জানালে আগামীকাল রোববার থেকে আবারও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, বিকাল পর্যন্ত বন্দরের চার নম্বর ফটকসহ সব কটি প্রধান ফটকে পণ্যবাহী যানবাহনের আনাগোনা নেই। বন্দরের ভেতরে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এলাকায়ও পুরোপুরি নীরবতা বিরাজ করতে দেখা গেছে। বন্দরের অভ্যন্তরে জেটিতে থাকা ১১টি কনটেইনার জাহাজের গ্যান্ট্রি ক্রেন ও জাহাজ ক্রেন গুটিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও কনটেইনার বা পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ চলেনি।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এমএ সালাম জানান, সামনে ইলেকশন, তিন দিনের ছুটি। ঠিক এর সাত-আট দিন পরে রমজান। রমজানের পণ্যগুলো কীভাবে ডেলিভারি হবে সেগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত। গার্মেন্টস সেক্টর বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে কাজ করবে মাত্র ১৮ দিন, মার্চে কাজ করবে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ দিন। এভাবে যদি বন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে প্রেজেন্ট পণ্যগুলো যাবে না, ভবিষ্যৎ পণ্যগুলো আসবে না। আমরা অসম্ভব ক্ষতির মুখে আছি, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর এবং রমজানের উসিলায় পুরো দেশবাসী। বন্দর যদি এভাবে বন্ধ থাকে, বন্দরের যে চার্জেসগুলো আসবে এগুলোর সবই দায়ভার ব্যবসার ওপর আসবে। আলটিমেটলি এটা কনজিউমারের ওপর যাবে।
এর আগে শনিবার থেকে তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছিল। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের বদলির ব্যবস্থা নেওয়ায় বিএনপিপন্থি শ্রমিকরা আরও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর ছিল কার্যত অচল। এর আগের দিন বুধবারও আন্দোলনকারীদের বাধায় কোনো জাহাজ জেটি ছাড়তে পারেনি। ফলে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বন্দরের এই অচলাবস্থার মধ্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। বন্দর ভবনের চার নম্বর গেটের বাইরে তিনি আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি বন্দর ভবনে প্রবেশ করে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে কেন্দ্র করে দিনভর আলোচনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলে।
উপদেষ্টা জানান, তিনি মোট তিনটি বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে দুটি হয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং ইসলামিক শ্রমিক সংঘের সঙ্গে। বৈঠকে শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করেছেন তিনি। বৈঠক শেষে নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। সেখানে তিনি বলেন, আমি সবাইকে অনুরোধ করেছি, আন্দোলন করা আপনাদের অধিকার। কিন্তু রোজার আগে এভাবে পোর্ট বন্ধ করে রাখা অত্যন্ত অমানবিক। এতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পায়, বাজারে তার প্রভাব পড়ে। পোর্ট বন্ধ রেখে আন্দোলন করার এখতিয়ার কারও নেই। এভিয়েশন ফুয়েল আটকে থাকায় বিমান চলাচলে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও তুলে ধরেন তিনি। ৩টার পর থেকে ভাটা শুরু হয়। এই সময় সাধারণত জাহাজ আনা যায় না। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। যদি কেউ বাধা দেয়, সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হবে। সেটা যেন না হয়, সেই অনুরোধ করেছি।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখানে যা ঘটছে, সব এখান থেকেই হচ্ছেÑবিষয়টা এমন নয়। অনেকের ইন্ধন রয়েছে বলে আমি মনে করি। সব বিষয়ে ফিরে গিয়ে আলোচনা করব। আমি আশা করি, আগামীকাল সকাল থেকেই যেভাবেই হোক চট্টগ্রাম বন্দর আবার সচল হবে। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এই সরকার নেবে না। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গেই এনসিটির চুক্তি হবে। সেই চুক্তি কীভাবে, কোন ধরনের হবে সেটা নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা চলছে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পরপরই ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ কর্মবিরতি দুদিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বিকালে বন্দর ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, রমজান মাস ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আগামীকাল শুক্রবার এবং পরদিন শনিবার আমাদের কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সময়ের মধ্যে উপদেষ্টা আমাদের দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
তবে এই স্থগিতাদেশ শর্তসাপেক্ষ বলেও জানান তিনি। ‘শনিবারের মধ্যে যদি কোনো সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে রোববার থেকে আমরা আবারও আমাদের কর্মসূচি শুরু করব’-বলেন হুমায়ুন কবীর।
সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘উপদেষ্টা মহোদয় আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই আমরা দুদিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেছি। বলা যায়, আজ বিকাল ৫টার পর থেকেই কর্মসূচি স্থগিত থাকবে।’
শ্রমিক নেতারা জানান, আন্দোলনের মূল কারণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া। তাদের দাবি, এনসিটি কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
ইব্রাহীম খোকন বলেন, আমাদের প্রথম প্রস্তাব ছিল, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অথরিটি তার নেই, তার ওপরেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রয়েছে। তিনি সরকারের সঙ্গে কথা বলে এক-দুদিনের মধ্যে আমাদের জানাবেন।
দ্বিতীয় দাবি হিসেবে আন্দোলন চলাকালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সব প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং তাদের স্ব স্ব পদে পুনর্বহালের কথা বলেন তারা। এ বিষয়ে উপদেষ্টা আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান নেতারা।
তৃতীয় দাবি, ভবিষ্যতে আন্দোলনের কারণে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এই বিষয়েও আশ্বস্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
উল্লেখ্য, এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি শুরু হয়। প্রথমে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে পরিচালিত হচ্ছে।
৩১ জানুয়ারি থেকে টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করা হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু হলে কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার বন্দরে আসেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post