নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : দীর্ঘদিন ধরে চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিলেও প্রায় দুই যুগেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে চেয়ারম্যান এমডিসহ একাধিক পদে রদবদলও হয়েছেন। তবে প্রত্যেকেই আশ্বাস দিয়েছেন উচ্চশিক্ষিত এসব গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গার্ড পদে কর্মরত কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করবেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এসব কর্মীর চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি ঝুলে আছে। স্থায়ী হতে ইতোমধ্যে এক্সিমের এসব কর্মী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান গভর্নর এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বরাবর একাধিকবার আবেদনও করেছেন।
দীর্ঘদিন অজ্ঞাত কারণে চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি আটকে থাকায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর থেকেই চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন এসব কর্মী। তাদের দাবি-‘প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার পরও আমাদের স্থায়ী করা হচ্ছে না। ক্ষেত্রবিশেষে আমরা ব্যাংকের অনেক স্থায়ী কর্মীর চাইতেও বেশি কাজ করছি।’
এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ মার্চ ব্যাংকের বোর্ডসভায় বিষয়টি উত্থাপন হবে পারে।
জানা গেছে, এক্সিম ব্যাংকের গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গার্ড পদে কাজ করছেন-এমন ৭০ জন কর্মী রয়েছে। এসব কর্মীর মধ্যে ১-২৫ বছর ব্যাংকে চাকরি করেও এখনও স্থায়ী হয়নি এমন কর্মীও আছেন। ইতোপূর্বে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানরা একাধিকবার আশ্বাস দিলেও এখনও বিষয়টি ঝুলে থাকায় এসব কর্মী এখন চাকরি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
জানা গেছে, চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য এক্সিম ব্যাংকের কর্মচারীরা ইতোপূর্বে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ও বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বরাবর আবেদন করেছিলেন।
কর্মচারীরা জানান, বর্তমানে ব্যাংকের বিভিন্ন সমস্যার কারণে তাদের মধ্যে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক পিএলসি মার্জ হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে রূপান্তর হওয়ার পর অনেক বড় বড় গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা অন্যত্র স্থানান্তর করায় গ্রাহক সংকট দেখা দিয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
তারা আরও বলেন, এর আগে এক্সিম ব্যাংকের অন্যান্য অস্থায়ী কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে। কিন্তু গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গার্ডদের বিষয়টি এখনও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে তারা আবেদন করার পর বিভিন্ন শাখার ব্যবস্থাপকরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত সুপারিশও করেছেন।
অস্থায়ী কর্মীদের দাবি, বিষয়টি ব্যাংকের প্রশাসককে অবহিত করা হলেও এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চাকরি স্থায়ী করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।
জানা গেছে, এক্সিম ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় ২৫ বছর ধরে গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গোডাউন গার্ডের চাকরি করছেন এমন ৭০ কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এখনও অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করছেন। এক্সিম ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিলেও তাদের চাকরিতে স্থায়ী করেননি। এ নিয়ে কথা বলায় নবাবপুর শাখা থেকে পাঁচ কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব ব্যাংক কর্মকর্তা স্থায়ী কর্মকর্তাদের মতোই কাজ করলেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এ নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার ঘটনায় ব্যাংকের অস্থায়ী কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা প্রকট হয়েছে।
এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক মো. শওকাতুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ওপর নির্ভর করবে তাদের চাকরি স্থায়ী করবে কিনা। তবে বিষয়টি মানবিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এমনটাই আশা করছি।
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকাতুল আলম পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের অংশ হিসেবে এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এ নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, এক্সিম ব্যাংকের গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গার্ডরা যে চাকরি স্থায়ী করার জন্য আবেদন করেছে বিষয়টি তার জানা নেই।
গত ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর আর্থিক সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। শেয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে। ব্যাংকটির অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হবেন।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো ধরনের কর্মকর্তা ছাঁটাই বা হয়রানি করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (ডিএমডি) একসঙ্গে ৩০ কর্মীকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে এক্সিম ব্যাংকের।
তাদের অভিযোগ ছিল যে, দক্ষ কর্মীদের টার্গেট করে ওএসডি করা হচ্ছে। এতে পুরো ব্যাংকের কর্মকর্তারা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকটির দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডেও।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়ে আসেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকগুলো।
এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে-বেনামে তাদের শেয়ার ও ঋণসম্পর্কিত সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে এখন পর্যন্ত আছে এক্সিম ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, ওই চারটি ব্যাংককে মার্জ করে কোনো লাভ হতো না। যাতে ব্যাংকগুলো ভালোভাবে চলতে পারে তাই একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় পড়ে যায় এক্সিম ব্যাংক।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ ও কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাংক থেকে বের হয়ে যান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ঘটনাপ্রবাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, শেষ পর্যন্ত চাপের মুখেই তাকে বিদায় নিতে হয়।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post