Print Date & Time : 23 May 2026 Saturday 11:13 pm

চার ব্যাংকের ব্যর্থতার ভার বইছে এক্সিম

নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : চার সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেগুলো হলো-ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক।

ছাত্র-জনতার অভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়ে আসেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকগুলো।

এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে-বেনামে তাদের শেয়ার ও ঋণসম্পর্কিত সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে এখন পর্যন্ত আছে এক্সিম ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, ওই চারটি ব্যাংককে মার্জ করে কোনো লাভ হতো না। যাতে ব্যাংকগুলো ভালোভাবে চলতে পারে তাই একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় পড়ে যায় এক্সিম ব্যাংক।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এখনও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক। নেই তারল্য সংকট, নেই নগদ জমা বা বিধিবদ্ধ জমার ঘাটতি। মূলধন ঘাটতিও নেই ব্যাংকটির। বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে নিয়মানুযায়ী পর্যাপ্ত জামানত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের করা অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউর (একিউআর) গত বছরের তথ্য মতে, এক্সিম ব্যাংকের ৫২ হাজার ৭৬ কোটি টাকার বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ২৫ হাজার ১০১ কোটি টাকাই খেলাপি, যা মোট ঋণের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।

এক্সিম ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের অপকর্মের কারণে এক্সিম ব্যাংককে নিয়ে এত সমালোচনা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার অতি দালালিই এখন ব্যাংকটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা বা পরিচালকের ভুলে পুরো ব্যাংককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক রোষানলের কারণেই ব্যাংকটিকে মার্জ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। নতুন সরকার এসে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অনুমোদন না করলে তখন কী হবে? আগাম কোনো কথা বলার আগে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। কারণ ব্যাংক খাত খুবই স্পর্শকাতর।’

ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, চারটি দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা আড়াল করতেই এক্সিম ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছিল। কারণ ওই সময়ে এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল এবং তারল্য ও পরিচালন সক্ষমতাও অন্যান্য দুর্বল ব্যাংকের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, স্বল্পমেয়াদে এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এতে একটি সুস্থ ব্যাংকের ওপর ঝুঁকি চাপানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিবাচক দিক হলো-যদি স্বচ্ছ অডিট, দায়দেনার প্রকৃত হিসাব এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এক্সিম ব্যাংকের শক্ত অবস্থান কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। তবে সংস্কার ছাড়া কেবল একীভূতকরণ করলে তা উল্টো আস্থার সংকট বাড়াতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অর্থনীতিবিদ শেয়ার বিজকে বলেন, এক্সিম ব্যাংকের মতো একটা শক্তিশালী ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজটা ভালো করেনি। বাজে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে এরকম বলির পাঁঠা অনেকেই হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে একীভূত করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। এই সময়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ইস্যুতে ব্যাংক থেকে চাঁদা তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলে জমা প্রদানে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতেন। ফলে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পান তিনি। সেই প্রভাব খাটিয়ে ২২টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অর্থ পাচার করে সম্পদ গড়েছেন বিদেশেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একাধিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে নজরুল ইসলাম মজুমদারকে সরিয়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০৭ সাল থেকে ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম। প্রায় দেড় দশক বিএবি সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত ৫ আগস্টের পর বিএবির সভাপতির দায়িত্ব থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

নজরুল ইসলাম মজুমদার পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপেরও চেয়ারম্যান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নজরুল ইসলাম মজুমদারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান থেকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।