শেখ শাফায়াত হোসেন : দাদাবাড়ি বাগেরহাটের কান্দাপাড়া গ্রামে। তবে জীবিকার প্রয়োজনে বাবা খুলনায় চলে আসে আমার জন্মের আগেই। বাবা তখন খুলনার গোয়ালখালী, কাশিপুরসহ আশপাশের এলাকাগুলোয় ব্যাচেলর জীবনযাপন করতেন। মায়ের মুখে শুনেছি, সাত দিন বয়সে আমাকে খুলনায় নিয়ে আসেন বাবা। সেই সুবাদে খুলনার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা। বাবা তার প্রথম জীবনে কাজের সন্ধান করতে গিয়ে কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে কাঠের আসবাব তৈরির কাজ শেখেন। আমি যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই দেখেছি খালিশপুর দূর্বারসংঘ ক্লাব সংলগ্ন বিআইডিসি রোডের একপাশে আমার বাবার কাঠের আসবাব তৈরির গোলা (দোকান)। পাশে ছিল চিত্রা স্টুডিও নামের একটি ছবি তোলার স্টুডিও এবং সাতরং নামের একটি সাইনবোর্ড লেখার দোকান। ওই এলাকায় বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে আমাদের আসবাবের দোকান বদল হলেও রাস্তার এপাশ-ওপাশের মধ্যেই ছিল। আমরাও এর আশপাশের এলাকাগুলোয় বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। বাবার তৈরিকৃত আসবাবের সুনাম ছিল। আর ওই এলাকায় আসবাবের গোলাও ছিল হাতেগোনা ৩-৪টি। আমরা বড় হতে হতে বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে বাবা বলতেন, খুঁজলে কাশিপুর বা খালিশপুর বা এর আশপাশের প্রায় সবার ঘরেই আমার তৈরি করা কোনো না কোনো আসবাব পাওয়া যাবে। কিছু না থাকলেও একটা দরজার খিল বা একটা পিঁড়ি আমার বাবার হাতে বানানো পাওয়া যাবে।
১৯৯৬ সালে আমি ক্লাস সিক্সে ওঠার পর বাবা তার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে কিছু পুঁজি জোগাড় করে খালিশপুর পাওয়ার হাউসগেটের কাছাকাছি একটি দোকান দিয়ে সাইজ কাঠের ব্যবসা শুরু করেন। খালিশপুর এলাকায় তখন বেশ কয়েকটি পাটকলের রমরমা অবস্থা। শ্রমিকরা তখন প্রতি বৃহস্পতিবার মজুরি পেতেন। ফলে শুক্রবার তারা আসতেন দোকানে কাঠ কিনে নানা ধরনের আসবাব বানাতে। আমার বাবার ব্যবসাও তখন ভালো চলছিল। ১৯৯৮ সালে আমার বাবা খালিশপুরের পাশের থানা দৌলপুরের দেয়ানা গ্রামে একখণ্ড জমি কিনে কাঠ ও টিনের একটি বাড়ি তৈরি করেন। ওই সময় থেকেই আমরা দেয়ানায় থাকি। আমি বাবার ব্যবসায় মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করি। ২০০০ সালে আমি এসএসসি পাস করি। একদিন বাবা দোকানে ছিল না, আমি দোকান সামলাচ্ছি। দোকানে মোটাসোটা একজন ভ্রদলোক এলেন তার বাড়ির দরজার খিল বানানোর জন্য একখণ্ড কাঠ কিনতে। সাধারণত স্থানীয় অনেক লোকই কাঠ কিনতে আসতেন যাদের কেউ কেউ কেতাদুরস্থও থাকতেন। আমি আট-দশজন ক্রেতার মতো তাকেও একটি শক্ত কাঠের বাতা দিলাম। তিনি আমাকে দামও দিলেন। দোকানের সামনে একটি চেয়ারে বসে কথায় কথায় জানতে চাইলেন আমি পড়ালেখা করি কি-না, থাকি কোথায়। আমি যখন বললাম, আমার বাড়ি দৌলতপুরের দেয়ানা গ্রামে। তখন তিনি জানতে চাইলেন দেয়ানার কোথায়। আমি বললাম, দেয়ানা মধ্যপাড়া। তিনি জানান, তার বাড়িও ওই এলাকাতেই। জানতে চাইলেন আমি তাকে চিনি কি-না। আমি বললাম, না। এর ব্যাখ্যাও দিলাম। বললাম আমরা তো ওখানকার স্থানীয় না। এ কারণে অনেককে চিনি না। পরে অবশ্য তিনি আর কথা বাড়ালেন না। তিনি চলে যাওয়ার পর পাশের এক দোকানে কাজ করা আমাদের থেকে বয়সে বড় একজন বললেন, আরে ওনাকে চিনিস না। ওনার নাম খোকন সাংবাদিক। বড় সাংবাদিক। পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় কাজ করেন।
আশপাশের অনেক দোকানে তখন পূর্বাঞ্চল পত্রিকা নিয়মিত রাখা হতো। আমরাও পড়তাম। ওই এলাকায় এ পত্রিকাটিই অনেক জনপ্রিয় ছিল। ওই পত্রিকার বড় একজন সাংবাদিকের পরিচয় পেয়ে আমার মতো একটি কিশোর ছেলের আর কিইবা ভাবার কথা। তারপরও ওই লোকটার অবয়ব আমার চোখে এখনও ভাসে। দেখতে আসলেই সাংবাদিকের মতো। বা সাংবাদিক সম্পর্কে এক কিশোরের যেমনটা ধারণা তাকে দেখতে হয়তো তেমনই লাগে। যদিও এর আগে কখনও কোনো সাংবাদিককে নিজ চোখে দেখিনি। এর ঠিক কতদিন পর ঠিক মনে নেই, একদিন শুনলাম (২০০২ সালের ২ মার্চ) খোকন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তখন জানলাম তার পুরো নাম হারুন-অর-রশিদ খোকন।
এর কয়েকদিন পর একদিন সকালে বা দুপুরে বাসা থেকে বের হয়েছি, গলির মাথায় যেতেই স্থানীয় লোকজন বলতে লাগল আজকে যাতে রাস্তায় না বের হই। কারণ ‘শেখের বেটি’ নিহত খোকন সাংবাদিকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আমাদের গ্রামে আসবে। মূলত খোকন সাংবাদিকের বাড়ি যাওয়ার আগেই আমাদের বাড়ি গলি পড়ে। ফলে উৎসুক অনেক জনতা বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে দেখার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওই বছরই আমি এইচএসসি পাস করি। পরীক্ষার সেন্টার পড়ে খুলনার সুন্দরবন কলেজে। পরীক্ষার হল থেকে বের হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং বা উচ্চশিক্ষা বিষয়ক লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ধরিয়ে দিত। একটি ব্রুশিয়ার পেলাম উচ্চশিক্ষা বিষয়ক। তাতে বলা ছিল, উচ্চশিক্ষা বিষয়ক একটি ফ্রি সেমিনারে অংশ নেয়া যাবে খুলনার শিববাড়ীর মোড়ের জিয়া হলে। পরীক্ষা শেষ করে বাসায় বসে না থেকে কী করা যায় তা ভাবতে ভাবতে মনে হলো সেই সেমিনারে যাব। সেখানে গিয়ে দেখি অনেক ছাত্রই এসেছে। জিয়া হল ভর্তি মানুষ। সামনের মঞ্চে অনেকেই বসা। একজন একজন করে বক্তৃতা দিচ্ছেন। একটা সময় ডায়াসে আসতে অনুরোধ করা হলো, সাংবাদিক মানিক সাহাকে। এর আগে কখনও তার কথা শুনিনি। তবে সাংবাদিক কেমন হয় এটা বোঝার জন্য বারবার তার কথার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছি। সম্ভবত তিনি তখন খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক সংবাদের খুলনার ব্যুরোপ্রধান। যাহোক, সেদিন তিনি ঠিক কী বলেছিলেন স্পষ্ট মনে নেই। তবে উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশে যাতে মেধা পাচার না হয় এবং শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করার বিষয়টি ওনার কাছ থেকে শুনে মনে হলো সেমিনারে এসে কিছু শিখলাম। অর্থাৎ এর আগে এই বিষয়ে আমার কোনো দর্শন ছিল না। বুঝতে শিখলাম মেধা পাচার দেশের জন্য ক্ষতি।
এদিকে আমার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় ২০০৩ সালে মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিই। লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির। চেষ্টা করে যাচ্ছি। এর মধ্যে একদিন খবরে দেখতে পেলাম (২০০৪ সালের ১৪ জানুয়ারি) সাংবাদিক মানিক সাহাকে হত্যা করা হয়েছে। রিকশা করে নিজ বাড়িতে যাওয়ার সময় খুলনা প্রেস ক্লাবের কাছেই বোমা হামলার শিকার হন তিনি।
ফলে গোটা খুলনাবাসীর মতো আমার কাছেও সাংবাদিকতা পেশা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে লাগল। তাছাড়া ২০০০ সালের পর খালিশপুরের নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ হয়ে যাওয়া ও কয়েকটি পাটকলে শ্রমিক ছাঁটাই ও বেতন আটকে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় প্রায়ই নানা ধরনের অস্থিরতা লেগে থাকত। আমাদের দোকানের পাশেই শ্রমিক কল্যাণ মাঠ (বর্তমানে ইউনিয়ন মাঠ হিসেবে পরিচিত)। ওই মাঠে অনেক সভাসমাবেশ হতো। ক্রিসেন্ট ও পিপলস মিলের সামনেও অনেক দিন রাস্তা বন্ধ করে সভাসমাবেশ করতে দেখেছি। আমাদের দোকানের আশপাশের দোকানের সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে দলবেঁধে এসব সভাসমাবেশ দেখতে যেতাম। আমাদের কাছে উৎসব উৎসব মনে হতো। দোকান বন্ধ, বেচাকেনার চাপ নেই। আবার কখনও কখনও পরিস্থিতি খুব ভয়ংকর রূপও নিত।
এতকিছুর মধ্যেও একের পর এক সাংবাদিক হত্যার খবর আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির চেষ্টারত এক শিক্ষার্থীর জীবনে আলাদা কোনো প্রভাব ফেলে কি-না তা কখনও ভাবিনি। শুধু ভাবতাম সাংবাদিক পেশার মানুষদের প্রতি সাধারণ মানুষের অনেক আগ্রহ। এর মধ্যেই আমি বিশ্ববিদ্যারয়ের ভর্তির প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ২০০৪ সালের কোনো একদিন আমি খুলনায় নিক্সন মার্কেট খ্যাত একটি মার্কেটে সস্তায় কিছু কাপড় কিনতে গেছি বা বানারীপাড়ায় ডলফিন গলিতে আমার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গেছি। সেখান থেকে ফেরার পথে হেঁটে হেঁটে ডাকবাংলোর মোড়ে যাব ভেবে হাঁটা শুরু করেছি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল দৈনিক জন্মভূমির অফিসের সাইনবোর্ডের দিকে। এর আগেই খুলনার অনেক জায়গায় এই পত্রিকাটি দেখেছি। ওই পত্রিকার অফিস চোখে পড়ায় কী ভাব তৈরি হয়েছিল তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এটা ঠিক সংবাদপত্র বিষয়টিকে কেমন যেন সবার থেকে আলাদা এবং সাংবাদিকদের অনেক জ্ঞানী মানুষ মনে হতো। এ কারণে এগুলোর প্রতি একটি টান ছিল। কত মানুষের লেখা ছাপা হয়, কত অজানা ঘটনা বের করে আনে সাংবাদিকরা। এ কারণে সাংবাদিকতাটাকে একটি রোমাঞ্চকর কাজ মনে হতো। জন্মভূমির অফিস দেখে আমি আমার মতো করে বাসায় ফিরে এলাম। ওই দিনই অথবা তার পরের দিন খুব সম্ভবত টেলিভিশনের খবরে দেখতে পেলাম (২০০৪ সালের ২৭ জুন) জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালুকে তার অফিসের সামনেই হত্যা করা হয়েছে। আমি হয়তো একদিন আগেই ওই পত্রিকার অফিসটা চিনলাম এবং সেখান থেকেই হেঁটে আসলাম যেখানে পত্রিকাটির সম্পাদককে হত্যা করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে আমার মায়ের সঙ্গে কথা বললাম। এর সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক তার কোনো আগামাথা পেলেন না। আমার মনে হচ্ছিল এই সাংবাদিকরা আমার অনেক দিনের পরিচিত।
এর অনেক দিন আগে খালিশপুরের এক পাটকল শ্রমিকদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক শ্রমিক নেতাকে বিআইডিসি রোডের ওপরে প্রকাশে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। সেদিন এত গণ্ডগোল হয়েছিল যে, আমি আর আমার বাবা দোকান বন্ধ করে দোকানের ভেতরেই বসে ছিলাম। ওই নেতা মারা যাওয়ার পর জানলাম তিনি অনেক লেখাপড়া জানা শ্রমিকনেতা ছিলেন। চেকোস্লাভিয়ায় লেখাপড়া করেছেন। এর আগে আমি চেকোস্লাভিয়ার নাম শুনিনি। কারণ তখন গুগলের যুগ ছিল না, টেলিভিশন আর পত্রিকার খবরই তথ্য প্রাপ্তির একটি বড় উৎস ছিল। ওই নেতাকে হত্যার পর অনেক পুলিশ, সাংবাদিক আসেন অনুসন্ধান করতে। কিন্তু আমার বাবা আগে থেকে বলে দিয়েছিলেন কারও সঙ্গে যেন কোনো কথা না বালি। কারণ আমার বাবা মনো করতেন আমি একটু আগ বাড়িয়ে কথা বলি। এরকম কোনো একদিন অনেক জনসমাগমের মধ্যে দিয়ে শ্রমিক কল্যাণ মাঠের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আশপাশের লোকজন বলছিল, ওই যে বেলাল সাংবাদিক। তখন অনেক মানুষের মধ্যে কে যে বেলাল সাংবাদিক তা ঠিকমতো চিনতে পারলাম না। পরে একদিন খবর দেখে জানতে পারলাম (২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি) খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের খুলনার ব্যুরোপ্রধান শেখ বেলাল উদ্দীনকেও হত্যা করা হয়েছে।
২০০৫ সালের এপ্রিলে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই এবং ভর্তির সিদ্ধান্ত নিই। তবে আমার বাবা সাংবাদিকতায় ভর্তির বিষয়ে বারবার নিষেধ করতে থাকেন। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে সাংবাদিকতা না করে বিসিএস দিয়ে অন্য চাকরিও পাওয়া যায়। এসব বলে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতায় পড়া শুরু করি। সেখানে ভর্তি হয়ে জানতে পারি, জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালুর ছেলে আসিফ কবিরও একই বিভাগ থেকে পড়ালেখা করেছেন। তবে তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার। এর এক বছর পর আমাদের পরের ব্যাচে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয় যশোরের নিহত সাংবাদিক শামসুর রহমানের মেয়ে সেঁজুতি রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়ালেখা শেষ করে আমিও এই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিই। মা-বাবার অমতে। তবে তাদের বোঝাতে হয়েছে, বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকতায় জীবনের ঝুঁকি তেমন নেই বললেই চলে।
প্রধান প্রতিবেদক, শেয়ার বিজ
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post