নুসরাত জাহান স্মরণিকা : একসময় ছাত্র রাজনীতি ছিল দীপশিখার মতো অন্ধকারে পথ দেখাত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আলো জ্বালাত। আজ সেই দীপশিখাই যেন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। আলো দেওয়ার বদলে আগুন ছড়াচ্ছে, পথ দেখানোর বদলে পথ রুদ্ধ করছে। যে রাজনীতি একদিন জাতির মেরুদণ্ড গড়ে তুলেছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে কাদা ছোড়াছুড়ির এক করুণ প্রদর্শনীতে। আদর্শের জায়গায় জায়গা নিয়েছে ক্ষমতার হিসাব, সংগ্রামের জায়গায় ব্যক্তিগত সুবিধার তালিকা।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সময়কালে ছাত্র সমাজ ছিল এ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি অধ্যায়ে ছাত্রদের ছিল দৃঢ়, স্পষ্ট ও সাহসী ভূমিকা। তারা রাজনীতি করেছিল জনগণের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির চরিত্র বদলাতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর ছাত্র রাজনীতি ধীরে ধীরে মূল রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হয়। আদর্শিক লড়াইয়ের জায়গায় প্রাধান্য পায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, হল দখল, টেন্ডার বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তার। ফলে ছাত্র রাজনীতি রাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার না হয়ে ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বর্তমান বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতায়। সামান্য মতবিরোধ থেকে শুরু হয়ে সংঘর্ষ, হল দখলকে কেন্দ্র করে মারধর, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আবাসন সংকট, সেশনজট, নিরাপদ ক্যাম্পাস, মানসম্মত শিক্ষা এসব ইস্যু অনেক সময়ই রাজনৈতিক ব্যানারের নিচে চাপা পড়ে যায়।
যেখানে ১৯৫২ সালে ছাত্ররা জীবন দিয়েছিল মাতৃভাষার জন্য, সেখানে আজ ছাত্র রাজনীতির বড় অংশ ব্যস্ত থাকে কে কোন পদ পাবে, কার পোস্টার বড় হবে, কার প্রভাব বেশি- এই হিসাবেই। জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সেখানে গৌণ হয়ে পড়ে।
বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এই অবক্ষয় হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, এর পেছনে দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত ও মানসিক সংকট কাজ করছে। প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। ছাত্র সংগঠনগুলো আজ আর স্বতন্ত্র কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়, তারা পরিণত হয়েছে বড় রাজনৈতিক শক্তির প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও লেজুড় সংগঠনে। ফলে ছাত্রদের সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ কিংবা ক্যাম্পাসের উন্নয়ন এসব গৌণ হয়ে পড়ে, মুখ্য হয়ে ওঠে দলীয় স্বার্থ রক্ষা। দ্বিতীয়ত, আদর্শিক চর্চার অভাব ছাত্র রাজনীতিকে শূন্য করে দিয়েছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের ছাত্র আন্দোলনগুলোতে একটি স্পষ্ট আদর্শ ছিল স্বাধীনতা, ন্যায্যতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার। কিন্তু বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে সেই আদর্শের জায়গা দখল করেছে ক্ষমতা অর্জনের তাড়াহুড়া। রাজনীতি শেখার আগে অনেকে শিখে যাচ্ছে কীভাবে প্রভাব খাটাতে হয়, কীভাবে ভয় দেখাতে হয়, কীভাবে সুবিধা আদায় করতে হয়। তৃতীয়ত, সহিংসতার সংস্কৃতি।
মতের ভিন্নতা যেখানে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, সেখানে ছাত্র রাজনীতিতে তা হয়ে উঠছে সংঘর্ষের কারণ। হল দখল, আধিপত্য বিস্তার, পদ-পদবির দ্বন্দ্ব এসব থেকে নিয়মিত সংঘর্ষ শিক্ষাঙ্গনকে ভয়ের জায়গায় পরিণত করেছে। অথচ এসব ঘটনার সঠিক বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহস পেয়ে যাচ্ছে। চতুর্থত, সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতি বিমুখতা। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখন রাজনীতিকে ভয় পায় বা ঘৃণা করে। ফলে সচেতন, মেধাবী ও নৈতিক শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই শূন্যস্থান দখল করছে সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে।
সবশেষে, ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি বা অকার্যকারিতা। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় নেতৃত্ব গড়ে ওঠার গণতান্ত্রিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। নেতৃত্ব আসছে মনোনয়ন আর ক্ষমতার জোরে, শিক্ষার্থীদের ভোটে নয় যা ছাত্র রাজনীতির মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিয়েছে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ছাত্র রাজনীতির মৌলিক সংস্কার। ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি থাকবে কিন্তু তা হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, দল-কেন্দ্রিক নয়। এতে করে ক্যাম্পাসের সমস্যা, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রাধান্য পাবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত নেতৃত্ব উঠে এলে জবাবদিহি বাড়বে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই নির্বাচন করতে পারলে রাজনীতির প্রতি আস্থাও ফিরবে।
তৃতীয়ত, সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। মত প্রকাশ, মিছিল বা আন্দোলন হবে কিন্তু তা হবে শান্তিপূর্ণ। ক্যাম্পাসে সহিংসতা ঘটলে দল-মত নির্বিশেষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতির বদলে যুক্তি ও আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। চতুর্থত, আদর্শিক ও নৈতিক শিক্ষা পুনরায় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ছাত্ররা বুঝতে পারে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা নয় এটি মানুষের জন্য কাজ করার দায়বদ্ধতা। সবশেষে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
ছাত্র রাজনীতি কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয় বরং সঠিক পথে পরিচালিত হলে এটি হতে পারে রাষ্ট্র পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় ছাত্র রাজনীতি তার পথ হারিয়েছে। ১৯৪৭-১৯৭১ এর ছাত্ররা যে আদর্শ, ত্যাগ আর দূরদৃষ্টি দেখিয়েছিল, তা আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ। আমাদের মনে রাখতে হবে রাজনীতি যেন ভয় নয়, দায়িত্বের জায়গা হয় এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ছাত্র রাজনীতি আবার রাষ্ট্র গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
