শিক্ষা ডেস্ক: ফাহিমের গল্পটা দিয়ে শুরু করা যাক। ঢাকার একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে (বিবিএ) স্নাতক শেষ করেছে সে। সিজিপিএ বেশ ভালো, ৩.৮০। বাবা-মা ভেবেছিলেন, ছেলে পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই বড় কোনো মাল্টিন্যাশনাল কো¤‹ানিতে চাকরি পেয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতার ধাক্কাটা ফাহিম খেলো ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে। প্রথম ইন্টারভিউতে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি কি ডেটা অ্যানালাইটিক্স বা পাওয়ার বিআই নিয়ে কাজ করতে পারেন?’ ফাহিম আমতা আমতা করে বলল, ‘আমাদের সিলেবাসে তো এসব ছিল না।’ দ্বিতীয় ইন্টারভিউতে প্রশ্ন এলো, ‘ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অ্যাডভান্সড টুলস নিয়ে কোনো ধারণা আছে?’ সেখানেও ফাহিমের উত্তরÑ‘না।’
অন্যদিকে, ফাহিমেরই বন্ধু সাদমান বিবিএ পড়ার পাশাপাশি অনলাইনে ছয় মাসের একটি ‘ডেটা সায়েন্স ও অ্যানালাইটিক্স’ কোর্স করেছিল। সাদমানের সিজিপিএ ফাহিমের চেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও সেই মাল্টিন্যাশনাল কো¤‹ানি সাদমানকেই লুফে নিল। কারণ সাদমানের কাছে সেই স্কিল বা দক্ষতাটি আছে, যা কো¤‹ানির এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ফাহিম ও সাদমানের এই গল্পটি শুধু দুজনের নয়, এটি আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ বেকারের গল্প। প্রতি বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু গালভরা ডিগ্রির সার্টিফিকেট থাকার পরও চাকরিদাতারা বলছেন, ‘আমরা যোগ্য লোক পাচ্ছি না।’ এই যে শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব কাজের বিশাল শূন্যতাÑএকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘স্কিলস গ্যাপ’। আর এই শূন্যতা পূরণের জাদুকরী সমাধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে একটি শব্দÑ‘মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল’ (গরপৎড়-পৎবফবহঃরধষং) বা ছোট, নির্দিষ্ট স্কিল-ভিত্তিক কোর্স। অনেকেই মনে করছেন, এই মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালই ধুঁকতে থাকা প্রথাগত উচ্চশিক্ষাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবে। কিন্তু কীভাবে? আজকের এই ফিচারে আমরা সেই গল্পটিই খুব সহজ ভাষায় জানার চেষ্টা করব।
মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল আসলে কী?
সহজ কথায়, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে আপনাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় শেখার জন্য চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে না। ধরুন, আপনার চার বছরের একটি ডিগ্রি হলো একটি বিশাল ‘বুফে’ খাবারের মতো। সেখানে পোলাও, রোস্ট ও রেজালা থেকে শুরু করে মিষ্টি, দইÑসব আছে। আপনাকে সবকিছুর জন্যই টাকা দিতে হচ্ছে, এমনকি যে খাবারটি আপনার পছন্দ নয়, সেটিও আপনার প্লেটে দেওয়া হচ্ছে (যেমন অনেক অপ্রয়োজনীয় কোর্স)।
অন্যদিকে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল হলো রেস্টুরেন্টের ‘আ লা কার্ট’ মেন্যুর মতো। আপনার শুধু এক বাটি স্যুপ খেতে ইচ্ছা করছেÑআপনি শুধু স্যুপের অর্ডার দেবেন, সেটার দাম মেটাবেন এবং খেয়ে বেরিয়ে আসবেন। অর্থাৎ, চাকরির বাজারে এই মুহূর্তে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের চাহিদা তুঙ্গে। আপনি শুধু এই নির্দিষ্ট বিষয়টির ওপর তিন থেকে ছয় মাসের একটি কোর্স করবেন, একটি সার্টিফিকেট পাবেন এবং সরাসরি কাজে নেমে পড়বেন। এটাই মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল। এটি খুব দ্রুত, নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী।
শিক্ষার্থীদের কেন এই কোর্সগুলোর প্রতি আগ্রহী হওয়া উচিত?
প্রথাগত চার বছরের ডিগ্রি হয়তো আপনার চিন্তার পরিধি বাড়াবে, কিন্তু বর্তমান যুগের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের এর প্রতি আগ্রহী হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছেÑ
প্রথমত, সময় ও অর্থের সাশ্রয়। একটি চার বছরের ডিগ্রি শেষ করতে যে পরিমাণ সময় এবং লাখ লাখ টাকা খরচ হয়, সবার পক্ষে সেই ভার বহন করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্সগুলো কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে শেষ করা যায় এবং খরচও অনেক কম।
দ্বিতীয়ত, সরাসরি চাকরির বাজারের সঙ্গে সংযুক্তি। এই কোর্সগুলো ডিজাইন করা হয় ইন্ডাস্ট্রি বা কো¤‹ানিগুলোর চাহিদার কথা মাথায় রেখে। গুগল, মাইক্রোসফট বা আইবিএমের মতো বড় বড় কো¤‹ানি এখন নিজেরাই এমন কোর্স করাচ্ছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী কোর্সটি শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারেন যে, বর্তমান চাকরির বাজারে ঠিক কোন কাজটির মূল্য সবচেয়ে বেশি।
তৃতীয়ত, নিজেকে আপডেটেড রাখা। প্রযুক্তির দুনিয়া বদলায় চোখের পলকে। আপনি চার বছর আগে যা শিখেছেন, আজ হয়তো তার কোনো অস্তিত্বই নেই। মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালের মাধ্যমে যেকোনো বয়সে, চাকরিরত অবস্থাতেও নতুন একটি স্কিল শিখে নিজেকে আপডেটেড রাখা সম্ভব।
চতুর্থত, সিভিতে আলাদা ওজন তৈরি হওয়া। যখন একজন চাকরিদাতা দেখেন যে আপনার সাধারণ ডিগ্রির পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর স্কেশালাইজড সার্টিফিকেট আছে, তখন অন্যান্য সাধারণ প্রার্থীদের চেয়ে আপনি সহজেই কয়েক কদম এগিয়ে থাকেন।
বিশ্বের সফল উদাহরণ এবং প্ল্যাটফর্ম
মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালের ধারণাটি কিন্তু হাওয়ায় ভাসছে না, বিশ্বজুড়ে এটি এরই মধ্যেই বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। যদি প্ল্যাটফর্মের কথা বলি, তবে কোরসেরা, এডেক্স, ইউডাসিটি বা গুগল ক্যারিয়ার সার্টিফিকেটসের নাম সবার আগে আসবে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোয় বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কোর্স অফার করছে।
বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি প্ল্যাটফর্মে ‘মাইক্রো-মাস্টার্স’ নামে একটি প্রোগ্রাম চালু করেছে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বা ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা অনলাইনে এই কোর্স করতে পারেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, কেউ যদি এই মাইক্রো-মাস্টার্স সফলভাবে শেষ করেন এবং পরে এমআইটিতে মূল মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন, তবে এই মাইক্রো-কোর্সের ক্রেডিটগুলো মূল মাস্টার্সের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাকে মাস্টার্সে কম কোর্স পড়তে হবে।
আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন ইউনিভার্সিটির। তারা সরাসরি ‘স্ট্যাকেবল ডিগ্রি’ চালু করেছে। এর মানে হলো, আপনি ছোট ছোট কয়েকটি কোর্স (মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল) করবেন। প্রতিটি কোর্সের জন্য পয়েন্ট বা ক্রেডিট জমবে। এভাবে কয়েকটি ছোট কোর্স মিলে যখন প্রয়োজনীয় পয়েন্ট পূর্ণ হবে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করবে। এটি যেন ছোট ছোট ইটের টুকরো দিয়ে একটি বিশাল ইমারত তৈরি করার মতো।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মডেলটি চালু করা খুব কঠিন কিছু নয়, শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনার। আমাদের সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েকটি ধাপে এটি তাদের কারিকুলামে যুক্ত করতে পারে।
১. ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের চার দেয়ালের বাইরে বেরিয়ে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আইটি ফার্মের সঙ্গে বসতে হবে। তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আগামী দুই বছরে আপনাদের কী ধরনের কর্মী লাগবে?’ তাদের উত্তরের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তিন থেকে ছয় মাসের শর্ট কোর্স চালু করতে পারে। এই কোর্সগুলো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পড়াবেন না, করপোরেট জগতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরাও এসে ক্লাস নেবেন।
২. মূল ডিগ্রির ভেতরেই মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল: চার বছরের স্নাতক ডিগ্রির কাঠামো ঠিক রেখেই এর ভেতরে এই কোর্সগুলো ঢোকানো সম্ভব। ধরুন, বিবিএ’র আটটি সেমিস্টারের মধ্যে সপ্তম সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হলো যে, তাদের কোরসেরা বা গুগলের নির্দিষ্ট একটি প্রফেশনাল মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্স স¤‹ন্ন করতে হবে। এই কোর্সটি সফলভাবে শেষ করলে সেটির মার্কস বা ক্রেডিট সরাসরি শিক্ষার্থীর মূল রেজাল্ট শিটে যোগ হবে।
৩. সবার জন্য উš§ুক্ত করা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দরজা শুধু ১৮-২২ বছর বয়সিদের জন্য খোলা রাখলে চলবে না। একজন ৪০ বছর বয়সি ব্যাংকার যদি ফিনটেক নিয়ে পড়াশোনা করতে চান, তবে তাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বা অনলাইনে তিন মাসের একটি মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্স করার সুযোগ দিতে হবে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আয়েরও একটি বড় উৎস তৈরি হবে।
৪. স্ট্যাকেবল বা ধাপে ধাপে জমানো ডিগ্রি: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘সার্টিফিকেট’, ‘ডিপ্লোমা’ এবং ‘ডিগ্রি’Ñএই তিনটি ধাপে শিক্ষা দিতে পারে। কেউ যদি ছয় মাসের কোর্স করে, সে পাবে সার্টিফিকেট। যদি সে আরও ছয় মাস পড়ে, তবে সেটি ডিপ্লোমায় রূপান্তরিত হবে। আর যদি সে সব মিলিয়ে তিন থেকে চার বছর পড়ে, তবে সে মূল ডিগ্রি পাবে। এতে করে মাঝপথে কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও তার অর্জিত শিক্ষা বৃথা যাবে না, তার হাতে অন্তত একটি সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা থাকবে, যা দিয়ে সে চাকরি খুঁজতে পারবে।
নীতিনির্ধারকের (ইউজিসি এবং বিএসি) জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলেই রাতারাতি এই ব্যবস্থা চালু করতে পারবে না, যদি না আমাদের নীতিনির্ধারকরা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) এটির জন্য একটি সঠিক এবং যুগোপযোগী পলিসি বা নীতিমালা তৈরি করে। তাদের জন্য নিচে কিছু সুস্কষ্ট গাইডলাইন তুলে ধরা হলো:
১. জাতীয় যোগ্যতার ফ্রেমওয়ার্ক আপডেট করা: বর্তমানে আমাদের একটি ‘ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ বা রয়েছে, যা মূলত প্রথাগত ডিগ্রির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইউজিসি’কে অতি দ্রুত এই ফ্রেমওয়ার্কটি আপডেট করে সেখানে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালকে একটি বৈধ এবং স্বীকৃত শিক্ষাপদ্ধতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোন কোর্সটি কত ঘণ্টার হলে কত ক্রেডিট পাওয়া যাবে, তার একটি সুস্কষ্ট জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করতে হবে।
২. ক্রেডিট ট্রান্সফার ও স্ট্যাক করার নীতিমালা প্রণয়ন: ধরুন, একজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সাইবার সিকিউরিটি’র ওপর একটি মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্স করল। পরে সে যদি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে যায়, তবে ওই ছোট কোর্সের ক্রেডিট যেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ইউজিসি’কে একটি ‘ন্যাশনাল ক্রেডিট ট্রান্সফার পলিসি’ তৈরি করতে হবে, যেন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত স্কিল অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সমাদৃত হয়।
৩. ‘ন্যাশনাল ক্রেডিট ব্যাংক’ বা জাতীয় ক্রেডিট ব্যাংক তৈরি: এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। ইউজিসি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ‘ক্রেডিট ব্যাংক’ তৈরি করবে। একজন শিক্ষার্থী জীবনে যতগুলো মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল বা শর্ট কোর্স করবে, তা সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হোক, বা কোরসেরার মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে হোকÑসবকিছুর রেকর্ড ও পয়েন্ট এই ডিজিটাল ব্যাংকে জমা থাকবে। যেকোনো সময় চাকরিদাতা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ব্যাংক থেকে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করতে পারবে। এটি অনেকটা আর্থিক ব্যাংকে টাকা জমানোর মতোই, এখানে শিক্ষার্থীরা তাদের ‘ক্রেডিট’ বা শিক্ষাগত পয়েন্ট জমাবে।
৪. মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা: একটি বড় শঙ্কা হলো, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালের নামে যত্রতত্র ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান খুলে সার্টিফিকেট বিক্রি শুরু হতে পারে। এখানেই বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের (ইঅঈ) কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্সকে ইঅঈ-এর কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। কোর্সের কারিকুলাম, শিক্ষকদের যোগ্যতা এবং পরীক্ষার পদ্ধতি যাচাই-বাছাই করার পরেই কেবল এই কোর্সের অনুমোদন দেওয়া হবে। গুণগত মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না।
৫. সরকারি চাকরিতে স্বীকৃতি: যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার নিজে এই ছোট কোর্সগুলোকে স্বীকৃতি না দিচ্ছে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের আস্থা আসবে না। নীতিনির্ধারকদের উচিত, বিভিন্ন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালকে অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
শেষকথা: আমরা আবার শুরুতে বলা ফাহিমের কথায় ফিরে যাই। যদি ফাহিমের বিশ্ববিদ্যালয় তাকে চার বছরের তত্ত্বীয় পড়াশোনার পাশাপাশি শেষ বছরে ডেটা অ্যানালাইটিক্স বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কোর্স করার সুযোগ দিত, তাহলে আজ হয়তো তাকে বেকারত্বের হতাশায় ভুগতে হতো না।
উচ্চশিক্ষা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো সিলেবাস আর মুখস্থবিদ্যার ওপর ভর করে গাদা গাদা বেকার স্নাতক তৈরি করার দিন শেষ হয়ে আসছে। এখন সময় বাস্তবমুখী দক্ষতার। মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল আমাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করবে না, বরং তাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করবে। এটি চার বছরের ডিগ্রির বিকল্প নয়, বরং একটি নিখুঁত পরিপূরক।
যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যত দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, তারাই আগামী দিনে টিকে থাকবে। আর যে নীতিনির্ধারকরা আজ এই পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করবেন, তারাই বাংলাদেশের যুবসমাজকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন। পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, এখন শুধু আমাদের পাল তুলে দেওয়ার অপেক্ষা। এই যাত্রায় আমরা যত দেরি করব, আমরা বিশ্বমঞ্চে ততটাই পিছিয়ে পড়ব। মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালের এই ছোট ছোট কোর্সই হয়তো আমাদের বিশাল উচ্চশিক্ষার জরাজীর্ণ জাহাজটিকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
