এফ আই মাসউদ : জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য বিগত দেড় বছরে পণ্যে শুল্ক বাড়ানো হয়নি। এটা নিশ্চিত থাকেন ট্যাক্স কালেকশন বাড়ানোর জন্য গত দেড় বছরে আমরা ট্যারিফ বাড়ায়নি। বরং জনগণের স্বার্থে চাল, পেঁয়াজ, আলু, সয়াবিন আমদানিতে ডিউটি কমিয়ে দিয়েছি। আমরা বলেছি, এটা জনস্বার্থে প্রয়োজন। বাজারে ফলসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, কর বা শুল্ক নয়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে শুল্কের অবদান ২৭ শতাংশ ছিল বলে জানান তিনি।
গতকাল রোববার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব ভবনে আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস-২০২৬ পালন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। সংবাদ সম্মেলন দুপুর ১২টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল। কাস্টমস দিবস উপলক্ষে আজ সোমবার এনবিআরে সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস ও কাস্টম স্টেশনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
২০২৬ সালের জন্য ডব্লিউসিও আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘কাস্টমস প্রোটেক্টিং সোসাইটি থ্রু ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট’। ডব্লিউসিওর অন্যান্য সদস্য দেশের মতো বাংলাদেশ কাস্টমসও এই প্রতিপাদ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২৬ জানুয়ারি দিনটি উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
ফলের ওপর উচ্চকর কেন-জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, কিছু জায়গায় ভুল তথ্য থাকে। আমরা দেড় বছরে ফলের ওপরে কোনো ডিউটি বাড়ায়নি। বরং ফল আমদানির ওপর আগে ১০ শতাংশ ইনকাম ট্যাক্স ছিল, সেটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যহারে ডিউটি কমানো হয়েছে।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ডলারের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। দুই বছর আগে যেখানে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১২৬-১২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে যে কোনো পণ্য আমদানিতে খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। বিদেশে থেকে ফল বা যাই আনবেন, এটাই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ, যোগ করেন তিনি।
আবদুর রহমান বলেন, সরকার সামগ্রিকভাবে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার (রেশনালাইজেশন) দিকে এগোচ্ছে। ট্যারিফ ট্রান্সফরমেশন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুল্ক কমানোর সুপারিশ রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আর উচ্চ শুল্ক কাঠামো ধরে রাখতে পারবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার স্বার্থে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয় বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় কিছু গ্যাপ থাকলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি খারাপ নয়। অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার পরে আমাদের রাজস্ব আদায় বেড়েছে।
অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থার প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করেছেন। অনলাইন রিটার্নের মাধ্যমে সরাসরি প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা গত বছর ছিল প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শেষ সময়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ করে রিটার্ন জমা পড়তে পারে। প্রয়োজনে সময় বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, শুধু দেশীয় কিছু শিল্পের সুরক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই এখন শুল্ক রাজস্ব আয়ের বড় উৎস নয়; বরং অবৈধ পণ্যের আমদানি বন্ধ করা ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার ঠেকানো শুল্ক বিভাগের প্রধান কাজ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে শুল্কের অবদান ছিল ২৭ শতাংশ।
এক প্রশ্নের জবাবে আবদুর রহমান খান বলেন, বিদেশি সিগারেট ঠেকাতে বিমানবন্দরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণ এই দুই অংশ আলাদা করার কাজ চলছে। শিগগিরই কমিটির বৈঠক, গেজেট প্রকাশ এবং সাংগঠনিক কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে। কাজটি চ্যালেঞ্জিং হলেও নির্বাচনের আগেই অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস আজ: পরিবর্তনশীল বিশ্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রকৃতি ও ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যার ফলে বাংলাদেশের বর্ডার এজেন্সিগুলোর কাজের কৌশল ও গুরুত্বেও এসেছে নতুন মাত্রা। একসময় রাজস্ব আহরণই কাস্টমসের প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই ধারণা পরিবর্তিত হয়ে বাণিজ্য সহজীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং চোরাচালান ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাস্টমসের এই বহুমুখী ভূমিকা ও গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউসিও প্রতি বছর একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে।
ফ্রন্টলাইন বর্ডার এজেন্সি হিসেবে বাংলাদেশ কাস্টমস দেশের সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম সহজীকরণের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। মাদক, অস্ত্র, অবৈধ স্বর্ণ এবং মানহীন খাদ্য ও ওষুধের প্রবেশ রোধসহ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডব্লিউটিও-টিএফএ, ডব্লিউসিও-আরকেসি এবং সিএমএএ চুক্তিসহ সার্ক, ডি-৮ এবং তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য দেশের কাস্টমস প্রশাসনের সঙ্গেও সহযোগিতা জোরদার করা হয়েছে। চোরাচালান শনাক্ত ও প্রতিরোধে ডব্লিউসিওর আরআইএলও এবং কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক বা সিইএন প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ কাস্টমসের ভূমিকা অপরিসীম। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট আয়ের ২৭ শতাংশই এসেছে কাস্টমস খাত থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক-কর যৌক্তিকীকরণ, দেশীয় শিল্পকে রেয়াতি সুবিধা ও ট্যারিফ সুরক্ষা প্রদান এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার মাধ্যমে রপ্তানি বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করা হয়েছে। এছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুল্ক হার যৌক্তিকীকরণ ও মেধাস্বত্ব বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সুগম করা হচ্ছে।
ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বা বাণিজ্য সহজীকরণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কাস্টমস আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশেষ জোর দিয়েছে। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, আইবাস প্লাস প্লাস ইন্টিগ্রেশন, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বা বিএসডব্লিউ এবং অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বাস্তবায়নের ফলে পণ্যচালান খালাস প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ ও পেপারলেস হয়েছে। টাইম রিলিজ স্টাডি অনুসারে, বর্তমানে ৯০ শতাংশ পণ্য এক দিনের মধ্যেই শুল্কায়ন সম্পন্ন হচ্ছে। এছাড়া নন-ইনট্রুসিভ ইন্সপেকশন, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর বা এইও, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ই-অকশন এবং ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত ও ঝুঁকিমুক্ত বাণিজ্য নিশ্চিত করতে কাস্টমস নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং চোরাচালানকারীসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধীদের নিত্যনতুন কলাকৌশলের কারণে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় টিকে থাকতে উচ্চ পেশাদারিত্ব, বিশেষায়িত জ্ঞান এবং দেশি-বিদেশি অংশীজনদের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যুগোপযোগী কর্মকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ কাস্টমস এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post