নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তীব্র জনবল সংকটের কারণে বাজার কারসাজি ও অনিয়মের তদন্ত কার্যক্রম সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজার সংস্কারের পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব। একই সঙ্গে জনস্বার্থে তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিদ্যমান লোকবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক তদন্ত কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে বিএসইসির অনুমোদিত অরগানোগ্রাম ৩৭০ জনের হলেও বাস্তবে কাজ করছেন মাত্র ২৬০ কর্মকর্তা। সরকারি বিধিবিধানের কারণে অরগানোগ্রামের বাইরে জনবল নিয়োগ সম্ভব নয়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীনভাবে কীভাবে জনবল সংকট মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে কমিশন কাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজার কারসাজির অভিযোগ তদন্তে বর্তমানে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মামলায় ৭, ৩০ বা ৪০ কর্মদিবস সময় বাড়াতে হয়। তবে এসব এক্সটেনশন সব ক্ষেত্রে দেওয়া সম্ভব হয় না, যার পেছনে প্রশাসনিক ও আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা নিজ বিভাগের বাইরে থেকেও একসঙ্গে চার থেকে সাতটি তদন্ত কার্যক্রমে যুক্ত আছেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, কার্যকর তদন্তের জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। পাশাপাশি অনেক তদন্ত মামলা আদালতের রিট ও আইনি জটিলতায় আটকে আছে। সম্প্রতি এক বছর পর একটি বড় রিট মামলায় কমিশন জয়লাভ করেছে, যদিও বিষয়টি আপিল বিভাগে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশেদ মাকসুদ বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলেছি, আইনের সীমার মধ্যেই সব কাজ করতে হবে। আইনি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই তদন্ত শেষ করা হবে।’ কার্যকর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশন কখনো পিছপা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।
আগের কমিশনের তদন্ত না হওয়ার কারণ ছিল অনীহা, আর বর্তমানে সময়মতো তদন্ত শেষ না হওয়ার প্রধান কারণ জনবল ও সময়ের অভাব। তবুও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কমিশন দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।
বিএসইসি অ্যাওয়ার্ড পেলেন ৯ সাংবাদিক: পুঁজিবাজারের ওপর স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং গবেষণামূলক সাংবাদিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিএসইসি ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিজম এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে রাশেদ মাকসুদ এসব কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে ৯ সাংবাদিককে পুরস্কৃত করা হয়। তাদের মধ্যে তিন ক্যাটেগরিতে তিনজন বিজয়ী এবং ছয়জন বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছেন। তবে এ বছর ফেলোশিপের জন্য কোনো আবেদন পড়েনি।
প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইনÑএই তিন ক্যাটেগরির প্রত্যেকটিতে তিনটি করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক ক্যাটেগরিতে একজন বিজয়ী এবং দুজন বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছেন।
প্রিন্ট ক্যাটেগরিতে বিজয়ী হয়েছেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আহসান হাবীব রাসেল। এই ক্যাটেগরিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাকের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জলিল রায়হান মুন্না এবং দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আনোয়ার ইব্রাহীম।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া ক্যাটেগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তৌহিদুল ইসলাম রানা, যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলমগীর হোসেন এবং এখন টিভির স্টাফ রিপোর্টার আতাউর রহমান। আর অনলাইন ক্যাটেগরিতে বিজয়ী হয়েছেন রাইজিং বিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এসএম নুরুজ্জামান তানিম। এই ক্যাটেগরিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন এবং বাংলানিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এসএমএ কালাম।
বিএসইসি ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিজম এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস অ্যান্ড ফেলোশিপ এবারই প্রথম চালু করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পুঁজিবাজারের ওপর স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং গবেষণামূলক সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করাই যার মূল উদ্দেশ্য।
এক সাংবাদিকের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান: বিএসইসির লাখ টাকার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন সাংবাদিক আনোয়ার ইব্রাহিম। এ সময় তিনি বলেন, বিএসইসির সাবেক দুই কমিশনার পুঁজিবাজারকে ধ্বংস করেছেন। আর বর্তমান কমিশনার পুরো বিএসইসিকেই ধ্বংস করে দিয়েছেন।
গত দেড় বছরে পুঁজিবাজারের কাক্সিক্ষত কোনো সংস্কার না হওয়ায় নিয়ন্ত্রণক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তীব্র সমালোচনা করেন বিএসইসির পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছে সাংবাদিক আনোয়ার ইব্রাহিম।
কারসাজির মাধ্যমে বিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করা, বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ করা। গত ৫ আগস্টের পর সংস্কারের নানা প্রস্তাবনা থাকলেও গত দেড় বছরে কাক্সিক্ষত কোনো সংস্কার না করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসির) চেয়ারম্যানের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার ইব্রাহীম। এ সময় বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে বিএসইসি ধ্বংসকারী বলেও মন্তব্য করেন এই সাংবাদিক।
গত কমিশনের সময় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজে দুস্বহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২২ সালের ২৫ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেটা পরে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর ছাপানো প্রিণ্ট পত্রিকায় আপনারা পেয়েছেন। ওই সময় আমাদের পত্রিকা বাজারে ছাড়তে দেয়া হয়নি। এমনকি ৮দিনের মাথায় ডিজিএফআই, ডিবি, এসবি এবং লোকাল পুলিশের সদস্যরা আমার বাড়িতে গিয়ে আমার চৌদ্দ গুষ্টির খবর নিচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, আমার বোন এর শ্বশুর বাড়িতে গিয়েও দরজায় লাথি মেরেছেন তৎকালীন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েও আমরা কাজ করেছিলাম।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ২০২২ সালের আমি একটা রিপোর্ট করে ছিলাম, সেখানে তথ্য ছিলÑ‘সাংবাদিককে তথ্য দিলে জেল।’ এই রিপোর্ট প্রকাশের পর কমিশনের কর্মকর্তাদের নোটিশ দেওয়া হয়। তৎকালীন কমিশনের চেয়ারম্যান সিসি ক্যামরা ফুটেজ দেখে তার কর্মকর্তা ও পিএস দিয়ে কর্মকর্তাদের ধমক দিতেন। তারপর আমি যখন কমিশনে আসতাম তখন চেয়ারম্যানের সিসি ক্যামেরা সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিতাম। আশা করেছিলাম এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবে না। এজন্যই আমি কাজ করেছি। কিন্তু এখনো এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছেই। রিপোর্ট করার কারণে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে সম্পাদককে ফোন করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বিএসইসি প্রধান, সালমান এফ রহমান, বিএফআইইউ’র প্রধান মাসুদ বিশ্বাস সমকাল সম্পাদককে ‘শেয়ারবাজার নিয়ে একটি শব্দও দেখতে চাই না’ বলে হুঁশিয়ার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি ১২টি নিউজের একটি সিরিজ রিপোর্ট করতে চেয়েছি। সবশেষ রিপোর্টের পর কমিশনে কিভাবে দুর্নীতি হয় সেই চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। সে রিপোর্টগুলো এখন প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা চেয়েছিলাম মার্কেটে একটা সংস্কার হোক কিন্তু কই? গত দেড় বছরে কি সংস্কার হয়েছে? কারসাজির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
বিএসইসি প্রধানের পদকে অটোক্রেটিক পোস্ট আখ্যা দিয়ে আনোয়ার আরও বলেন, এই কমিশনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি একটি অত্যন্ত অটোক্রেটিক পোস্ট। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। আমরা আশা করেছিলাম আগের কমিশনের সময় যেসব ঘটনা ঘটেছে, সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু সেই সবকিছুই পরিবর্তন হয়নি।
আনোয়ার ইব্রাহিম আরও বলেন, খায়রুল ও শিবলী কমিশন মার্কেট ধ্বংস করে গিয়েছিল, আর এই কমিশন পুরো কমিশনকে ধ্বংস করেছে। হাতুড়ি থাকলে আপনি একটি ভাঙা চেয়ার-টেবিলকে ঠিক করতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি হাতুড়ির হাতলটাই ভেঙে ফেলেন তাহলে আপনি কী দিয়ে ঠিক করবেন। কমিশনের ক্ষেত্রে আমাদের যে বিশ্বাস ছিল সেই বিশ্বাসটাই নষ্ট করে দিয়েছে। এই চেয়ারম্যান বলেছিলেন ১২টা তদন্ত কমিটি হবে, কিন্তু গত দেড় বছরে কোনো সংস্কার দেখলাম না। কোথায় কমিশনের সংস্কার, কোথায় ডিএসইর সংস্কার, স্টক এক্সচেঞ্জের সংস্কার কোথায়, ব্রোকারেজ হাউসের সংস্কার কোথায়? শুধু এই কথাগুলো বলার জন্যই পুরস্কারের জন্য আবেদন করেছিলাম আমি।
বিএসইসির দেওয়া এই পুরস্কারকে নিজের জীবনে পাওয়া প্রথম পুরস্কার বলেও জানান সিনিয়র এই সংবাদিক। অনুষ্ঠান সবশেষে ফটোসেশনে আনোয়ার ইব্রাহিমকে বিএসইসির পক্ষ থেকে অংশ গ্রহণের অনুরোধ জানালেও সেখানে অংশ নেননি তিনি।
