Print Date & Time : 28 April 2026 Tuesday 12:16 pm

জনবল হারাচ্ছে ইসলামি ব্যাংক খাত

আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দেশের ব্যাংক খাতে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে জনবলের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট জনবল নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। যদিও সর্বশেষ এক মাসে সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে, তবে বার্ষিক হিসাবে খাতটিতে প্রায় তিন হাজার কর্মসংস্থান কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট জনবল দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২৪০ জনে। এর আগের মাস জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৬১ জন। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে জনবল বাড়ে ১৭৯ জন বা শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে বছরওয়ারি হিসাবে চিত্রটি ভিন্ন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট জনবল ছিল ৪৮ হাজার ১৯ জন। সেই তুলনায় এক বছরে জনবল কমেছে ২ হাজার ৭৭৯ জন, যা প্রায় ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার বিস্তারের কারণে অনেক ব্যাংকে ম্যানুয়াল প্রশাসনিক কাজের প্রয়োজন কমে গেছে। ফলে নতুন নিয়োগ কমেছে, কিছু ক্ষেত্রে কর্মীসংখ্যাও হ্রাস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার অভিযোগ সামনে আসে। এরও প্রভাব পড়েছে জনবল কাঠামোর ওপর। বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোতে কর্মীসংখ্যা তুলনামূলক দ্রুত কমেছে।
অন্যদিকে প্রচলিত ধারার যেসব ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং উইন্ডো বা শাখা পরিচালনা করছে, তারা ধীরে ধীরে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। এসব ব্যাংকে জনবল কিছুটা বাড়ছে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমানতে ফিরছে আস্থা: একসময় পরিচালকদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির কারণে বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আবারও আমানত বাড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে পরিচালিত ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে গত এক বছরে আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে এসব ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার ১২ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকায়।
শুধু এক মাসের ব্যবধানেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে এসব ব্যাংকের আমানত ছিল ৪ লাখ ৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে আমানত বেড়েছে ২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইসলামি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরছে। গত মঙ্গলবার শুধু আমাদের ব্যাংকেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে। আমরা গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে কাজ করছি।’
ইসলামি এনবিএফআই খাতেও জনবল কমছে: শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের ইসলামি কার্যক্রমেও জনবল কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামি এনবিএফসি কার্যক্রমে মোট জনবল দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ জনে, যা জানুয়ারি ২০২৬ সালে ছিল ৩৪০ জন। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে জনবল কমেছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।প্রথম পৃষ্ঠার পর
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই খাতে কর্মরত ছিলেন ৩৭০ জন। সেই তুলনায় এক বছরে জনবল কমেছে ৩৫ জন বা ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এটি ইসলামি এনবিএফসি কার্যক্রমে মানবসম্পদের ধীরে ধীরে সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক খাতে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন বৃদ্ধির ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে ম্যানুয়াল প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত কাজের প্রয়োজন কমে গেছে। ফলে কর্মী নির্ভরতা আগের তুলনায় কমছে।
আমদানি-রপ্তানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসলামি ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছিল ৯২ কোটি ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে কমে ৬৯ কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এক মাসে আমদানি বিল পরিশোধ কমেছে ২৩ কোটি ডলার।
একইভাবে রপ্তানি আয়ও কমেছে। জানুয়ারিতে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয় আসে ৫৪ কোটি ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ৪৯ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ কোটি ডলার।
সুশাসন ফেরানোর তাগিদ: অর্থনীতি গবেষক হেলাল আহম্মেদ খান বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ নতুন আশা তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত আবারও উদ্বেগ তৈরি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইন পাস হওয়ার পর অনেক গ্রাহক নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন। তারা মনে করছেন, অতীতে যারা অনিয়ম করেছে তাদের আবার সুযোগ দেওয়া হলে আমানত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কোনো ব্যাংক লোকসান করলে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল কম-বেশি করতে পারে। তবে চাকরি থেকে অব্যাহতির ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। যদি প্রতিহিংসাবশত কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আমানত বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় অতীতের সংকট আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যাবে।