মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মানুষ কি কখনও অমর হতে পারবে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রশ্নটি দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা আবারও সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
গবেষকদের একটি অংশ দাবি করছেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চিকিৎসা ও জৈবপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষের জীবনকাল এতটাই বাড়তে পারে যে ২০৫০ সালের পর মানুষ কার্যত “অমরত্বের কাছাকাছি” পৌঁছে যেতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা এখনো গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়েই রয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত লাইন আছে—“জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে।” মানবজীবনের এই চিরন্তন সত্যকে বিজ্ঞান কি বদলে দিতে পারে?
গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরের বার্ধক্য মূলত কোষের ক্ষয়, জিনগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল। যদি এই প্রক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে পুনরায় পুনর্গঠন করা যায়, তাহলে মানুষের জীবনকাল অনেক দীর্ঘ হতে পারে।
কিছু বিজ্ঞানী মনে করছেন, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির এমন উন্নতি হতে পারে যা বার্ধক্যকে ধীর করে দেবে বা অনেক ক্ষেত্রে উল্টে দিতেও সক্ষম হবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে Genetic Engineering মানুষের জীবন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জিন পরিবর্তন বা সংশোধন করা সম্ভব। বার্ধক্যের কারণে যে কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করা বা নতুন কোষ তৈরি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নতুন করে শক্তি ফিরে পেতে পারে এবং দীর্ঘ সময় সুস্থভাবে কাজ করতে পারে।
শুধু জেনেটিক প্রযুক্তিই নয়, আরও কিছু আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি মানুষের জীবন দীর্ঘ করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন— Nanomedicine** শরীরের ক্ষুদ্র স্তরে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করতে পারবে। Stem Cell Therapy** ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু ও অঙ্গ পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে। Gene Therapy** বিভিন্ন জিনগত রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি বার্ধক্যের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এই প্রযুক্তিগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করা গেলে মানুষের শরীরকে দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখা সম্ভব হতে পারে বলে গবেষকরা ধারণা করছেন।
যদিও এই প্রযুক্তিগুলো ভবিষ্যতে মানুষের জীবন দীর্ঘ করতে পারে, তবে গবেষকরা বলছেন শুরুতে এই চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
এর ফলে প্রথমদিকে শুধুমাত্র ধনী ব্যক্তিরাই এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন। তবে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে খরচ কমে গেলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেও চলে আসতে পারে।
গবেষকদের একটি ধারণা হলো—যদি আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তিগুলো কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে যারা বর্তমানে তুলনামূলক কম বয়সী, বিশেষ করে ৪০ বছরের নিচে, তারা সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকলে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তির সুবিধা পেতে পারেন।
তখন মানুষের জীবনকাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং অনেক রোগ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
যদি মানুষ সত্যিই দীর্ঘজীবী বা কার্যত অমর হয়ে ওঠে, তাহলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—
* জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে
* কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির কাঠামো বদলে যেতে পারে
* সমাজের নৈতিক ও দার্শনিক ধারণাগুলো নতুনভাবে ভাবতে হতে পারে
মানুষের জীবন যদি শত শত বছর দীর্ঘ হয়, তাহলে শিক্ষা, পরিবার, কর্মজীবন—সবকিছুই নতুনভাবে সংগঠিত করতে হবে।
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলছেন, মানুষের অমরত্ব এখনো নিশ্চিত কোনো বাস্তবতা নয়। এটি কেবল সম্ভাবনার একটি ধারণা মাত্র।
এই প্রযুক্তিগুলো সফলভাবে কার্যকর হবে কি না, কিংবা মানুষের শরীর কতটা এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে—তা এখনো গবেষণার বিষয়।
তাই ভবিষ্যতে সত্যিই মানুষ “অমরত্বের কাছাকাছি” পৌঁছাতে পারবে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে।
মানুষ হাজার বছর ধরে অমরত্বের স্বপ্ন দেখেছে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই স্বপ্নকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
যদিও বিষয়টি এখনো অনেক দূরের সম্ভাবনা, তবুও জৈবপ্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি মানবজীবনের সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষের জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাই পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন
