শেখ শাফায়াত হোসেন : ছাত্রদের আন্দোলনে গুলি চালানোয় সেই আন্দোলনে এসে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। দেশ হয়ে পড়ে উত্তাল। কারফিউর মধ্যে রাস্তায় মুহুর্মুহু গুলি। ইন্টারনেট বন্ধ। কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামা ছেলেদের লাশ পড়ছে। সড়ক থেকে হাসপাতাল সবখানেই রক্তের দাগ। ভয়-আতঙ্ক মানুষের চোখেমুখে। এত মানুষের মৃত্যু আর নিতে পারছিল না সাধারণ মানুষ। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কে ধরবে এই বিধ্বস্ত দেশের হাল? এ নিয়ে দেখা দেয় নতুন সংকট। নেতৃত্বশূন্য একটি রাষ্ট্র সুগঠিত করতে ছাত্রদের আহ্বানে দেশের হাল ধরলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বলছিলাম অর্থনৈতিক গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটের কথা।
ক্ষুদ্রঋণের ধারণা প্রবর্তনের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে বৈশ্বিক অবদান তাকে এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভূমিকার দিকে ধাবিত করেছে বলেই সবার ধারণা। একজন সফল অর্থনৈতিক উদ্ভাবকের রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদে আসীন হওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন এক প্রত্যাশা। সামগ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন এক অধ্যায়। এ কারণে তার দায়িত্বগ্রহণ বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ চলে আসে আলোচনার পাদপ্রদীপে।
স্বল্প পরিষরে জেনে নেওয়া যাক এই কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে। ড. ইউনূস ১৯৪০ সালের ২৮ জুন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বাথুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে ১৯৬২ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
দেশে ফিরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তার যুগান্তকারী কাজ ছিল ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া এবং পরে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রবিত্তের ধারণা প্রবর্তন করেন। এটি কেবল একটি আর্থিক মডেল ছিল না, বরং দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর একটি দার্শনিক চেষ্টা ছিল। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল প্রথাগত ব্যাংকিং ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত বিশেষত গ্রামীণ মহিলাদেরকে ঋণের আওতায় আনে। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তার মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননার তালিকায় রয়েছে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ২০১০ সালে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল। তিনি এমন সাতজন ব্যক্তির একজন, যিনি এই তিনটি সম্মান—নোবেল শান্তি পুরস্কার, প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন। এই বিরল অর্জন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার কাজের গভীর প্রভাব এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে নির্দেশ করে।
অধ্যাপক ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত। ২০১২ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব এতটাই গভীর যে, তিনি শুধু অর্থনীতিবিদ হিসেবে নয়, বরং একজন সামাজিক উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত। তিনি তার অর্থনৈতিক কর্মসূচি-সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী বই প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘Banker to the Poor : Micro-Lending and the Battle Against World Poverty¯ এবং `A World of Three Zeros : The New Economics of Zero Poverty, Zero Unemployment, and Zero Net Carbon Emissions¯। এই বইগুলোড তিনি তার সামাজিক ব্যবসার (Social Business) ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে ব্যবসার মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়, বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান করা।
এছাড়া তিনি গ্রামীণ আমেরিকা ও গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বোর্ড সদস্য হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে সহায়তা করেন এবং ১৯৯৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিককালে ২০২২ সালে তিনি ইলেকট্রনিক স্পোর্টসের (ই-স্পোর্টস) উন্নয়নে গ্লোবাল ই-স্পোর্টস ফেডারেশনের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের আগ্রহ দেখান।
অর্থনীতির অঙ্গন থেকে সরাসরি সরকার পরিচালনায় তার প্রবেশ এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে আমূল পরিবর্তন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্¿ী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এবং ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আহ্বানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলে খালাস পাওয়ায় তার দেশে ফিরে আসা ও নতুন এই পদে নিয়োগ সহজতর হয়। তিনি ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গণপ্রজাতন্¿ী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে সংস্কার আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েই তিনি এই পদে আসীন হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, এর আগেও তিনি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরিবেশ ও বন মন্¿ণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ জন মুসলিমের তালিকায় এবং ২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় ড. ইউনূসের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া তার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব ও জনমানসে তার গ্রহণযোগ্যতাকে তুলে ধরে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই অর্থনীতিবিদের দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন নীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে নতুন পথ উন্মোচন করতে পারে।
ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে আলাদাভাবে গুরুত্বও পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্কারোপের ক্ষেত্রেও তেমনটা দেখা গেছে। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম শুল্ক আরোপ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post