রোদেলা রহমান : শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হলো না। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার লিভ টু আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে আগামী সংসদ নির্বাচনে তার আর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলো না। তিনি ছাড়াও কুমিল্লা-১০ আসনে আবদুল গফুর ভূঁইয়াও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।
মূলত ঋণ খেলাপির দায়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর দায়ের করা রিট আবেদনের ভিত্তিতে এই পরিণতি। প্রথমে উচ্চ আদালত মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগেও উচ্চ আদালতের সেই রায় বহাল থাকলো।
এই রায়ের মাধ্যমে কুমিল্লার দুটি আসনে দুজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলো। কিন্তু অনেকটা একই ধরনের অভিযোগে নিয়ে আরও অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এসব প্রার্থীর অধিকাংশই বিএনপির মনোনীত। যাদেরকে নির্বাচন কমিশন ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু সেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে কেউ উচ্চ আদালতে অভিযোগ তোলেনি বলে তাদের প্রার্থিতা এখনও টিকে আছে।
তবে বর্তমান সরকার আরপিওতে যেসব সংশোধনী এনেছে, তাতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কোনো প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে যদি সংশ্লিষ্ট এলাকার কোনো ভোটার বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অভিযোগ তোলেন এবং সেই অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয় তাহলে ওই ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।
আবার রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) আপিল বিভাগে কুমিল্লার দুটি আসনের দুজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপিল বিভাগের এই রায় একটি রেফারেন্স হিসেবে পরিগণিত হবে। ফলে এই রায়কে একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করে পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তি যদি জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করেন, তাহলে সেই রিট গৃহীত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও যেসব ব্যক্তি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন, তারা যদি নির্বাচিত হন, তাহলে যে কারণে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, সেই একই কারণে ঋণ খেলাপির দায় নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
কেবল এই ৪৫ জনই নয়, আরও ২২ জন ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যারা দ্বৈত নাগরিক। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং রাষ্ট্রের বিদ্যামান কিছু আইন অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ২২ জনকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ২২ জনের মধ্যে ১০ জন বিএনপির, ৩ জন জামায়াতে ইসলামীর, একজন এনসিপির, একজন স্বতন্ত্র, একজন ইসলামী আন্দোলনের এবং বাকিরা অন্যান্য দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। এই ২২ জনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রায় লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শাম্মী আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও এসএম মনিরুজ্জামানের বেঞ্চ ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ওই রায় ঘোষণা করেছিলেন। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, শাম্মী আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার দ্বৈত নাগরিক। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর তার অস্ট্রেলীয় নাগরিকত্ব বাতিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন তখনও পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি এবং সেটি নিষ্পত্তি হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন ছিলো। কাজেই যতোদিন সেটি নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততোদিন শাম্মী আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার দ্বৈত নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। ফলে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
উচ্চ আদালতের এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২২ জন দ্বৈত নাগরিককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিচ্ছে। শাম্মী আহমেদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। বর্তমানে যে ২২ জনকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তারাও অন্যান্য দেশের নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেছেন এবং সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে উচ্চ আদালতের ওই রায় অনুযায়ী, এসব ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়া সুযোগ থাকে না।
সবমিলে মোট ৬৭ জন এমন প্রার্থীকে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রার্থিতার বৈধতা, এমনকি তারা নির্বাচিত হলে তাদের সংসদ সদস্য পদ উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। আর আদালত যদি এসব ব্যক্তির সংসদ সদস্যপদ বাতিল করে রায় প্রদান করেন, তাহলে সেই সংসদের ভবিষ্যৎ কি হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। এমন ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, নির্বাচন কমিশন কি আগামী নির্বাচনে একটি ঝুলন্ত সংসদ উপহার দিতে চলেছে?
রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান নানা অনিয়ম, বৈষম্য, অবিচার ইত্যাদির বিলোপসাধন করে একটি ন্যায়বিচার ও সুশাসনভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিলো। সবার প্রত্যাশা ছিলো যে, নাগরিকরা যেমন আইন মেনে চলবেন, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও আইন অনুযায়ী সব নাগরিকের সঙ্গে সমান আচরণ করবেন। কিন্তু বর্তমানে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার কোনো মিল নেই। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন নিজেই প্রচলিত বিধিবিধান লঙ্ঘন করছে বলে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিশেষ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ইসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঋণ খেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে নমনীয়তা দেখানো হয়েছে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ হওয়া জরুরি। এখানে ক্ষেত্র বিশেষে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। সেটা করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাছাড়া যারা নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাগ, অনুরাগ, আবেগ ও কারোর প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকবেন বলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু ঋণ খেলাপি ব্যক্তি ও দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে ইসি তার শপথের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছেন বৈকি। এমন পরিস্থিতি কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আমরা এমন কোন সংসদ দেখেতে চাই না, যে সংসদে ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি তাদের সংসদ সদস্যপদ উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার মাধ্যমে বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। আমরা এমন ব্যক্তিদেরকেই সংসদে পাঠাতে চাই, যাদের বিরুদ্ধে বেআইনি কোন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়ে আঙ্গুল তোলার সুযোগ থাকবে না।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post