Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 3:20 pm

জাপানে আগামী বছর থেকে দক্ষ কর্মী যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ থেকে এক লাখ দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেবে জাপানের ‘ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কো-অপারেটিভস’ (এনবিসিসি)। এই বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে সংগঠনটির ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

৬৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জাপানি ফেডারেশন এনবিসিসি সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে জাপানে দক্ষ কর্মী প্রেরণের জন্য প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও কর্মসংস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করা। এই চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি) ও স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার্স (এসএসডব্লিউ) কর্মসূচির মাধ্যমে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিনিধিদল জানায়, প্রথম ধাপে আগামী বছর দুই হাজার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। ২০২৭ সালে ছয় হাজার এবং ২০২৮ সালে ১৮ হাজার কর্মী নেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকবে নির্মাণ, সেবা, অ্যাভিয়েশন, গার্মেন্টস ও কৃষি খাতে। এছাড়া ভবিষ্যতে গাড়িচালক, অটোমোবাইল ও রিসাইক্লিং শিল্পেও  দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন বাড়বে।

বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে খুলনা ও গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। এনবিসিসি প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে কেন্দ্র দুটি পরিদর্শন করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বৈঠকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি আছে কিনা তা জানতে চান। এনবিসিসি চেয়ারম্যান মিকিও কেসাগায়ামা জানান, ‘গত মার্চে কেন্দ্রগুলো দেখেছিলাম, এখন এসে বিশাল পরিবর্তন দেখছি। মাত্র সাত মাসে প্রশিক্ষণে অনেক উন্নতি হয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট এবং আগামী বছর থেকেই দুই হাজার কর্মী নিয়োগ দিতে পারব বলে আশাবাদী।’ তবে তিনি প্রশিক্ষকদের ভাষাগত দক্ষতা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

ভাষাগত দক্ষতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘জাপানি ভাষা শেখানোর জন্য ভার্চুুয়াল ক্লাস চালু করা যেতে পারে। জাপান থেকে অনলাইনে শিক্ষক পাঠানো বা এখানকার প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশি নারীরা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও যত্নশীল। বিশেষ করে কেয়ারগিভিং সেক্টরে তারা দারুণভাবে কাজ করতে পারে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করলে জাপানের কেয়ার সেক্টরে তারা অনন্য ভূমিকা রাখবে।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কিছুটা কঠিন মনে হলেও বাংলাদেশের মেয়েদের একবার শিখিয়ে দিলে তারা নিজেরাই অন্যদের শেখাতে পারবে। একবার যাওয়া শুরু হলে অন্যরাও উৎসাহ পাবে।’

এনবিসিসি প্রতিনিধিরা জানান, আগামী কয়েক বছরে জাপানে ৪ লাখের বেশি দক্ষ নার্সের প্রয়োজন হবে। তারা বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি নার্স নিয়োগের বিষয়ে বিবেচনা করবেন।

বৈঠকে উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, সরকার জাপানে কর্মী প্রেরণের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং সমস্যাগুলো সমাধানে মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।

এদিকে জাপানে দক্ষ চালকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ স্কুল গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাপানি উদ্যোক্তা ও রাজনীতিক মিকি ওয়াতানাবে। যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ স্কুল গড়ার ঘোষণা দেন জাপানি উদ্যোক্তা ও রাজনীতিক মিকি ওয়াতানাবে।

ওয়াতামি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মিকি ওয়াতানাবে বলেন, আমরা প্রায় ১২ হাজার বর্গমিটার জায়গা খুঁজছি একটি ড্রাইভিং স্কুল স্থাপনের জন্য। জাপানে দক্ষ চালকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশ এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তির উৎস হতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন ঢাকার উপকণ্ঠে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা হয় ড্রাইভিং স্কুলটির জন্য।

বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় অধ্যাপক ইউনূসের গত মে মাসের জাপান সফরের ধারাবাহিকতায়, যেখানে জাপানি উদ্যোক্তারা আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

ওয়াতানাবে জানান, তিনি ইতোমধ্যে মনোহরদীতে (মুন্সীগঞ্জ জেলা) একটি ভাষা প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে অন্তত ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ জন কর্মী ইতোমধ্যেই জাপানে গেছেন। তারা নির্মাণ ও কৃষি খাতে কাজ করছেন বলে জানান ওয়াতানাবে।

সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা জাপানি সংস্কৃতি, শিষ্টাচার ও আচরণবিধি শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, জাপানি শিষ্টাচার ও সংস্কৃতি শেখানো একাডেমির প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। এটি বাংলাদেশিদের জাপানকে ভালোভাবে বুঝতে এবং সেখানে গিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করবে।

এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা ওয়াতানাবেকে পরামর্শ দেন, যেন প্রশিক্ষণের পরিধি বর্ধিত করে কেয়ারগিভিং, নার্সিং, নির্মাণ ও কৃষিক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, কারণ এসব খাতে জাপানে দক্ষ কর্মীরা উচ্চ বেতন পান।