দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশের আয় তাদের খরচের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সরকারি-বেসরকারি নানা সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। অনেকেই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মুখাপেক্ষী। বৈশ্বিক অতিমারি কভিডের পর এই চাপ আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। পিপিআরসির গবেষণা অনুসারে, জনসংখ্যার সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের প্রতি মাসের গড় আয় ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা। কিন্তু মাসে এসব পরিবারের খরচ ১৭ হাজার ৩৮৭ টাকা। এ ছাড়া মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসে গড় আয় ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা। কিন্তু সংসার চালাতে এসব পরিবারের খরচ করতে হয় ২৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা।
সীমিত ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী সংসার পরিচালনায় নিদারুণ ভোগান্তিতে রয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। জরিপের তথ্য বলছে, দেশের অন্তত ৩৪ শতাংশ পরিবার শুধু সংসার চালাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বর্তমানে দেশে চার কোটির বেশি পরিবার আছে। সংসার চালাতে প্রয়োজন অনুসারে আয় করতে না পারলে ধারদেনা করে দেশের অনেক পরিবার। তবে একেক পরিবারের প্রয়োজন একেক ধরনের। যেমন সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ করেন এ দেশের মানুষ। বড় ধরনের রোগ হলে খরচ চালাতে ঋণ নেয়া ছাড়া আর বিকল্প থাকে না। তাই ঋণ নেয়ার দ্বিতীয় বড় কারণ চিকিৎসার খরচ মেটানো। বাড়ি বা ফ্ল্যাটনির্মাণ বেশ খরচসাপেক্ষ; ফলে নিজের জমানো টাকাপয়সায় অনেকের পক্ষে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। তাই ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ বা মেরামতের খরচ জোগাতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের মানুষ মাসের একটা সময়ের পর হাতে টাকা না থাকায় বাকিতে পণ্য কিনতে বাধ্য হন। মাস শেষে বেতন বা মজুরি পেলে সেই বাকির টাকা পরিশোধ করেন। নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার জন্য অনেকে ঋণ নেন।
এর বাইরে অন্য কারণেও ঋণ নিতে হয় নিম্ন আয়ের মানুষকে; যেমন কৃষির খরচ, আগের ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা খরচ, বিদেশ যাওয়ার খরচ, অস্থাবর সম্পত্তি কেনা, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া, ভাড়া মেটানো, যৌতুক প্রদান, মুঠোফোন কেনা, চাকরির জন্য ঘুষ, বিদ্যুৎ-সংযোগের খরচ ও চাঁদা বা জবরদস্তির খরচ মেটানো প্রভৃতি।
সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাইলেও তা যে সরকারের পক্ষে সহজসাধ্য নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বলে কি হাল ছেড়ে দিতে হবে! সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার চিহ্নিত করতে হবে আগে। কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক করতে হবে। সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে হবে।