ইব্রাহীম খলিল : একটা সময় ছিল যখন যুবকেরা স্বপ্ন দেখত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার, শিল্পী হওয়ার, দেশ গড়ার কারিগর হওয়ার। আজ তাদের একটা বড় অংশ স্বপ্ন দেখে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার। কিছুদিন আগেও যে ছেলেটা টিউশনি করে বা ছোট চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত, এখন সে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু সেই স্বপ্নের রং তো মেকি, তাতে রংতুলি হলো জুয়ার বিষাক্ত ছোবল। তারা বুঝতে পারে না, যেই জুয়ার নেশায় আজ তারা বুঁদ হয়ে আছে সেটা কোনো সোনালি হাইওয়ে নয়, একটি অন্ধকার টানেল যার শেষপ্রান্তে অপেক্ষা করছে শুধুই ধ্বংস, সর্বনাশ আর অসীম অন্ধকার। বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই এই প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে বেকার যুবকদের মধ্যে জুয়ার প্রতি আকর্ষণ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকরি নেই, আয় নেই, অথচ মোবাইল আছে, ইন্টারনেট আছে, আর আছে ‘দ্রুত ধনী হওয়ার’ এক বিভ্রম। এককালে যেখানে জুয়াড়িদের আড্ডা হতো অন্ধকার ঘরে, লুকিয়ে চুরিয়ে, আজ সেখানে সুন্দর করে ডিজাইন করা অ্যাপ, প্রলোভনসঙ্কুল অফার আর ‘বিনিয়োগের বিকল্প’ এর মোহনীয় মোড়কে সাজানো এক ভয়ংকর ফাঁদ। এখন জুয়া চলে প্রকাশ্য দিবালোকে, সবার চোখের সামনে, তাদের হাতের মুঠোয়। বাসে, চায়ের দোকানে, এমনকি ক্লাস রুমে বসেও ছেলেগুলো বাজি ধরছে। কিসের বাজি? ক্রিকেট খেলা, ফুটবল ম্যাচ, অনলাইন গেম সবকিছুতেই চলছে টাকার খেলা। শুরু হয় অল্প অল্প করে, একটু উৎসুকতায়, বন্ধুদের প্ররোচনায়, আবেগে বা শুধুই সময় কাটানোর নামে। এক ক্লিকে শুরু হয় এক বিভ্রম, যা শেষ হয় নিঃস্বতায়। এই জালে আটকা পড়লে বের হওয়ার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হতে থাকে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি এমন এক গ্রাসকারী চক্রের জন্ম দেয় যেখানে বিজয়ের উত্তেজনা এবং পরাজয়ের হতাশার দোলাচলে আটকা পড়ে যুবকেরা। মস্তিষ্ক তখন ডোপামিন নামক রাসায়নিকের এক বিষাক্ত খেলায় মত্ত হয়। জেতার সময় যে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, তা এমন এক আনন্দের সংকেত দেয় যা পুনরায় অনুভবের জন্য তারা আরও বেশি বেশি জুয়ায় মত্ত হয়। ভাবতে থাকে এই তো সফলতা আর বেশি দূরে নয়। হারজিতের পালাবদলে সামনে আসে আসল সমস্যা। হারার বেদনা তাকে আরও ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করে, হারানো টাকাটা তুলে নেয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু এই চক্করে পরে সে নিজের বাকিটুকু ও খসিয়ে দিয়ে হয়ে যায় নিঃস্ব-সর্বস্বান্ত। জুয়া শুধু টাকাই শেষ করে না, একটা মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়। যে ছেলেটা একসময় হাসিখুশি ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, এখন সে সারাক্ষণ টেনশনে ভোগে। বাবা-মার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। রাতে ঘুম হয় না। জুয়া খেলার টাকা জোগাড় করতে না পারলে সে চুরি-চামারি থেকে শুরু করে ছিনতাই, খুন পর্যন্ত করে। পাওনাদারদের ভয়ে ঘর ছেড়ে পালায়। অনেক সময় দেখা যায়, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে কেউ কেউ। এই ব্যক্তিগত ধ্বংসস্তূপের ছাই উড়িয়ে যায় পরিবারের ওপর। মা-বাবার আজীবনের সঞ্চয়, বোনের গহনা, সংসারের জরুরি প্রয়োজনের টাকা সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবারে শুরু হয় অবিশ্বাস, কলহ, আর আর্থিক দুরবস্থার দুর্বিষহ জীবন। অনেক সময় এই ঋণের বোঝা পরিবারকেও দীর্ঘদিন টানতে হয়, তাদের স্বপ্নগুলোও ধুলিস্যাৎ হয়। কিন্তু এর প্রভাব তার চেয়েও সুদূরপ্রসারী। যখন একটি দেশের যুবশক্তি, যে দেশের মেরুদণ্ড, সে যখন জুয়ার নেশায় আক্রান্ত হয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এক ভয়ংকর সংকটের জন্ম দেয়। একটি প্রজন্ম যে উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল হওয়ার কথা ছিল, তারা হয়ে পড়ে অলস, অসৎ ও হতাশাগ্রস্ত। সমাজে বাড়ে অপরাধ, বাড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা। দেশের ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি যখন নিজের ভবিষ্যতই নষ্ট করছে, তখন জাতির সামগ্রিক অগ্রগতির গতিপথও ব্যাহত হয়। জুয়া যুবকদের স্বপ্নকে প্রতিযোগিতার বদলে শর্টকাট সফলতার ধারণায় অভ্যস্ত করে তুলে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে জীবনে পরিশ্রম নয়, ভাগ্যই সবকিছু। কিন্তু বাস্তবতা হলো জীবনে সফল হওয়ার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। কষ্ট না করলে কোনো ফল পাওয়া যায় না। যে টাকা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে আসে, তা আবার ভাগ্যের হাত দিয়েই হারিয়ে যায়। কিন্তু যে সাফল্য আসে পরিশ্রম, মেধা আর সততার শক্তিকে আশ্রয় করে তা কখনও পদস্খলিত হয় না। সত্যিকারের স্বপ্ন কখনও জুয়ার টেবিলে তৈরি হয় না, তা গড়ে ওঠে পরিশ্রম, সততা ও মেধার শক্তিতে। আজ সময় এসেছে জুয়া নামক এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। যদি আমরা আজ এই জুয়ার ভয়াবহতা না বুঝি, তাহলে আমাদের যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যুব সমাজকে রক্ষা করতে হবে, তাদের স্বপ্নকে বাঁচাতে হবে। না হলে এই জাতি হারাবে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার তরুণ শক্তি। শুধু আইন করলেই হবে না, দরকার মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, পুনর্বাসন কেন্দ্র, সচেতনতা কর্মসূচি, আর সবচেয়ে বেশি দরকার তরুণদের আস্থার ভরসা। একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে যুবকরা জুয়া খেলছে শুধু অর্থের জন্য নয়, তারা খেলছে এক ধরনের শূন্যতা থেকে। এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে, সুযোগ দিয়ে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, তাদের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মতো ইতিবাচক বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে। পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে, তাদের সময় দিতে হবে, তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে। স্কুল-কলেজে জুয়ার ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে, সেমিনার, নাটক, পোস্টার সবকিছু ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। মিডিয়াকে এগিয়ে আসতে হবে, জুয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। জনপ্রিয় নাটক, সিনেমা, গান সবকিছুতে জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলেই আশা করা যায় আমাদের যুবসমাজ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে, নকল স্বপ্ন থেকে বাস্তবে এসে টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
