নকীবুল হক : আমাদের জেনারেশন—আমরা যারা জেন-জি, তারা বড় হয়ে ওঠার শুরু থেকেই রাজনীতি বলতে মূলত একটি দীর্ঘ শাসনামলকেই দেখে এসেছি। শাসনব্যবস্থা, ক্ষমতার চর্চা ও রাষ্ট্রীয় বয়ান—সবকিছুই ছিল প্রায় একমুখী। পারিবারিকভাবে আমাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সংশ্লিষ্টতা না থাকায় কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির প্রতি আলাদা করে শ্রদ্ধা কিংবা ভালোবাসা কখনো গড়ে ওঠেনি।
রাজনৈতিকভাবে মোটামুটি সচেতন হতে শুরু করি ক্লাস নাইন-টেন থেকে। তখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকেন্দ্রিক বই পড়ার সুযোগ হয়—‘বঙ্গবন্ধু ও ইসলাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রভৃতি। এগুলো সচেতনভাবে বাছাই করা পাঠ্যতালিকা ছিল না; বরং সময় ও পরিবেশ আমাকে ওই পাঠের মধ্যেই প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল।
ফলে তখন আমার মানসপটে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস বলতে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানই প্রধান হয়ে উঠেছিলেন। তাদের সম্পর্কে আমার জানাশোনা খুব গভীর ছিল, এমন নয়। শেখ মুজিব বাদে অন্যদের সম্পর্কে জেনেছি সীমিত পরিসরেই। কিন্তু সেই অল্প জানাশোনাই তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করেছিল।
বিশেষ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আমাকে তার প্রতি অনুরাগী করে তোলে। এই অনুরাগ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। মাদরাসা জীবনে তাকে নিয়ে কবিতা, গল্প ও ছড়া লিখেছি; জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ছড়া সংকলনে সর্বকনিষ্ঠ ছড়াকার হিসেবেও তালিকাভুক্ত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু-সম্পর্কিত নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি, পুরস্কার পেয়েছি।
এই অনুরাগের মধ্যেই একসময় আমার চিন্তার পরিসরে যুক্ত হয় শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। ২০২১ সালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও হাসিনা যখন জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব কেড়ে নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে, তখন জনমতের প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ ও আলোচনা তাকে নতুন করে জানতে আমাকে আগ্রহী করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি আমার কাছে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জায়গা করে নেন।
চব্বিশের আগে শেখ মুজিবের রাজনীতি বা শাসন নিয়ে নেতিবাচক কিছু যে শুনিনি, তা নয়। বাকশাল, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক হত্যা—এসব বিষয় শ্রুতিগোচর হয়েছে, কৌতূহলী হয়ে কিছু জানার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু তবুও তার রাজনৈতিক আদর্শ বা শাসনের বিরুদ্ধমত প্রকাশ করার মতো পরিস্থিতি ‘রাজনৈতিক ছায়াবিহীন আমি’র ছিল না। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী আচরণের সমালোচনা করার পর শেখ মুজিবের স্তুতি গেয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে যে, আমি ‘জামায়াত-শিবির’ নই। ফলে শেখ মুজিবের শাসনামলের বিতর্কিত আলোচনা ও কর্মকাণ্ড সচেতনভাবেই চাপা পড়ে গেছে অনুরাগ ও আবেগের আড়ালে।
এই জায়গায় এসে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য এক বড় বাঁক। যে জেনারেশনকে একসময় রাজনীতিবিমুখ বলা হতো, সেই জেনারেশনকেই এই অভ্যুত্থান রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলেছে। আমরা বুঝতে শিখেছি, রাজনীতি মানে শুধু দল নয়, রাজনীতি মানে রাষ্ট্র, জনগণের অধিকার, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা।
এই অভ্যুত্থানের আরেকটি বড় অবদান হলো আমাদের সামনে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিবিদদের দৃশ্যমান করা। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও আপসহীন কণ্ঠহীন রাজনীতি দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম যখন নিজের চোখে ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা দেখে, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ও সাহস তৈরি করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে এনে দিয়েছিল একজন ওসমান হাদিকে, যার রাজনৈতিক অনুপ্রেরণায় ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে এই আন্দোলন আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় একজন আপসহীন বাংলাদেশপন্থি নেত্রীর সঙ্গে, ভারতবিরোধিতা প্রশ্নে যিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশ ছোট হতে পারে, কিন্তু আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ আছে। বড় দেশ বলে ভারত যা বলবে তা মেনে নিতে হবে এটা হতে পারে না। আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে অন্যায়ের কথা আমাদের বলতেই হয়। সেজন্য যদি আমাদের ভারতবিরোধী মনে করা হয়, তাহলে আমার কিছু বলার নেই।’
তিনি বলেছিলেন, দেশের বাইরে তার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই মাটি, এই মানুষই তার পরিচয়। তিনি তার কথা রেখেছেন। দেশ ছেড়ে কোথাও যাননি। এই দেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই প্রমাণ করে, তিনি কতটা দেশের ছিলেন, কতটা মানুষের ছিলেন। তার জানাজায় ইমামতি করেছেন বরেণ্য মুহাদ্দিস মুফতি আব্দুল মালেক।
স্বস্তির বিষয় হলো, ফ্যাসিস্ট আমলে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়নি। তিনি এমন এক সময়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, যখন মানুষ মুক্তভাবে শোক প্রকাশ করতে পেরেছে, ভালোবাসা জানাতে পেরেছে এবং পরিবার শোকের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়নি।
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, অন্ধ অনুরাগ নয়, সচেতন ভালোবাসাই রাজনীতির ভবিষ্যৎ। ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করতে হবে, কিন্তু প্রশ্ন করাও শিখতে হবে। হয়তো এই প্রশ্ন করার জায়গাতেই জেন-জির রাজনীতির নতুন পাঠ শুরু।
লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post