প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ: উজানে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আগাম বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট ও শ্রমিক সংকটে বোরো ধান কাটায় ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যা হাওরের প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সুরমা, কুশিয়ারা ও বাউলাই নদীর উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনে পানি আরও বাড়তে পারে এবং যেকোনো সময় আগাম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় যেসব জমির ৮০ শতাংশ ধান পেকেছে, সেসব জমির ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় প্রায় দুই লাখ কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তবে ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ৭৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।
কোথাও কোথাও পাকা ধান কাটা শুরু হলেও অধিকাংশ হাওরে এখনো কাটার কাজ শুরু হয়নি। অনেক জায়গায় ধানক্ষেত অর্ধেক পানির নিচে ডুবে রয়েছে। ফলে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যা কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে ডিজেল সংকটের কারণে কৃষিযন্ত্র চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকের অভাবও প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা শ্রমিক সংকট নিরসনে বালু ও পাথর মহাল অন্তত ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন।
মাটিয়ান হাওর পাড়ের কৃষক সাহেল খান জানিয়েছেন, এক কেয়ার জমি কাটার জন্য হারভেষ্টার মেশিনে ১ হাজার ৯০০ টাকার কথা থাকলেও বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে দ্বিগুণ টাকা দিয়েও ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
শনির হাওরপাড়ের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিক সংকট অনেক বেশি। এক হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
হারভেস্টার মেশিনচালক জোসেব মিয়া বলেন, জ্বালানি তেল অনেক দূর থেকে নিয়ে আসতে হয়, তাছাড়া সবসময় পাওয়াও যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় ৯০০টি হারভেস্টার মেশিন প্রস্তুত রয়েছে এবং রিপার মেশিনের মাধ্যমেও ধান কাটার কাজ চলবে। তবে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় যন্ত্র ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, ইতোমধ্যে ১৩৭টি হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কাটার কাজ চলবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ মের মধ্যে ধান কাটা শেষ করার আশা করা হচ্ছে। ডিজেল সংকট নিরসনে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, হাওরে ফসল রক্ষায় নির্মিত বাঁধগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে পানি অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বালু, পাথর ও শুল্ক স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি ও শ্রমিক সংকট নিরসন করে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব না হলে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে।

Print Date & Time : 25 April 2026 Saturday 2:49 am
ঝুঁকিতে হাওরের কৃষি অর্থনীতি
দিনের খবর ♦ প্রকাশ: