নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ফলে ভারত ও চীনের রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়বে। ফলে কিছু রপ্তানি আদেশ বাংলাদেশে চলে আসবে। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশ ১২৭ কোটি থেকে ২৩২ কোটি ডলার রপ্তানি থেকে বাড়তি আয় করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন।
গতকাল শনিবার ঢাকার পল্টনে ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত মোয়াজ্জেম হোসেন স্মারক বক্তৃতায় এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন ড. জাহিদ হোসেন।
এ সময় তিনি বলেন, ভারত এবং চীনের ওপরে ট্রাম্প প্রশাসন যে হারে শুল্ক আরোপ করেছে তাতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামনে মার্কিন বাজারে ২০৫ কোটি ডলার বা তার কিছু বেশি পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর প্রয়াত সম্পাদক এবং ইআরএফের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন। অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার এই পথিকৃতের স্মরণে গত কয়েক বছর ধরে এ ধরনের স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে আসছে ইআরএফ।
অনুষ্ঠানে ‘দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কেমন চলছে’ তার ওপর বক্তৃতা করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে ভারতকে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে গত ২৭ তারিখ থেকে। যেখানে আমরা দিচ্ছি ২৫ শতাংশ শুল্ক। চীনের থেকে আমাদের ১০ শতাংশ শুল্ক কম দিতে হচ্ছে। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও চীন থেকে সর্বনিম্ন ১২৭ কোটি ডলার এবং সর্বোচ্চ ২৩২ কোটি ডলারের রপ্তানি আমাদের কাছে চলে আসতে পারে।
এর মধ্যে ভারত থেকেই বেশি আসতে পারে। সর্বনিম্ন ১২০ কোটি ডলার থেকে ২০৭ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি ভারত থেকে আমাদের দেশে চলে আসতে পারে। আর চীনের ওপরে বেশি শুল্কারোপ করার কারণে ৭ থেকে ২৫ কোটি ডলার রপ্তানি আমাদের কাছে চলে আসতে পারে।’
এ সময় তিনি তিনটি প্রধান ভাগে আলোচনা এগিয়ে নেন। এর মধ্যে অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল সেই প্রসঙ্গে ড. জাহিদ বলেন, কিছু কিছু সূচকে ভালো করেছে। গত অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমেছে। টাকার দরপতন কিছুটা কমেছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। কার্পেটের তলে থাকা খেলাপি ঋণ বেরিয়ে এসেছে। এতে বলা যায়, অর্থনীতিতে স্বস্তি বেড়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে আন্তরিক, কিছু ক্ষেত্রে সাহসী, আবার বেচারা ও দিশেহারা বলেও মন্তব্য করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো দেখেই আমি সরকারকে বেচারা ও দিশেহারা বলছি।’
জাহিদ হোসেন বলেন, বিগত সময়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সব জায়গায় দুর্নীতি হয়েছে। সেই করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে গত এক বছরে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। অর্থ পাচার ও ব্যাংকের লোপাট কমেছে। ডলারের মূল্য কমেছে বাংলাদেশের জন্য অনুকূলে এসেছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে লুটপাট বন্ধ হওয়ায় ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরেছে উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, এর জন্য কিছু করতে হয়নি। লুটেরারা পালিয়ে যাওয়ায় এটা সংয়ক্রিয়ভাবে হয়েছে। তাছাড়া যাদেরকে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান পদগুলোতে বসানো হয়েছে তারাও যথেষ্ট যোগ্য লোক।
অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে কিনা সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। যে ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে সে ধরনের কর্মী পাওয়া যায় না। আবার কর্মীরা যে ধরনের কাজ খুঁজছেন সে ধরনের কাজ পযাপ্ত নেই।
জনকল্যাণ বা প্রান্তিক পযায়ের মানুষ কেমন আছে সে প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সার্বিকভাবে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর ফাঁদে আটকে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক খাত, লজিস্টিক সিস্টেমের দুর্বলতা, অনুন্নত লেবার মার্কেট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এর অন্যতম কারণ।’
সংস্কার প্রসঙ্গে ড. জাহিদ বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই যে সংস্কার হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। সংস্কারের সুফল পৌঁছে দেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। এখানে কাদের কণ্ঠস্বর সংস্কারের পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করে আগে তাদের বুঝতে হবে, এরা কারা। এরা হলো, উপদেষ্টা পরিষদ, প্রশাসন, ব্যবসায়ী নেতা এবং রাজনৈতিক দলসহ নাগরিক সমাজ। এই চারটি গোষ্ঠী যদি সংস্কারের জন্য একসঙ্গে কাজ না করে, কোথাও না কোথাও গিয়ে সংস্কারটি আটকে যাবে।’
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং দি ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মাহবুবুর রহমান বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যে ওঠে আসে মোয়াজ্জেম হোসেনের দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিষ্ঠার গল্প। সেই সঙ্গে বর্তমান সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যে সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তবে এ কথাগুলো তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

Discussion about this post