নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে হতাশ হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিদর্শক দল। কোম্পানিটির কার্যক্রম সরেজমিনে যাচাই করতে ডিএসইর প্রতিনিধি দলটি ২০২৫ সালের ৩ ও ৪ নভেম্বর ঢাকা ও নরসিংদীতে থাকা কোম্পানিটির চারটি কারখানা পরিদর্শন করে এমন হতাশা প্রকাশ করেন। যদিও পরিদর্শক দলটি কোম্পানিটির ঢাকাস্থ দুটি কারখানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে গতকাল বুধবার ডিএসইর নিয়মিত সংবাদে প্রকাশে জানানো হয়েছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর প্রতিনিধিদলটি ঢাকার আশুলিয়া, সাভারে অবস্থিত কোম্পানির কারখানা পরিদর্শন করে। সেখানে কারখানাটি চালু অবস্থায় পাওয়া যায় এবং উৎপাদন কার্যক্রম চলমান ছিল। তবে একই বছরের ৪ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত কোম্পানিটির আরেকটি কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে সেটি বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই ইউনিটে কোনো ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম চালু নেই বলে ডিএসইর প্রতিনিধিদলটি নিশ্চিত হয়েছে।
ডিএসইর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোম্পানির সামগ্রিক কার্যক্রম ও উৎপাদন পরিস্থিতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এই পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে এ ধরনের পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে ডিএসই।
এদিকে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের শেয়ারদর গতকাল বুধবার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনশেষে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ৪১ টাকা ৬০ পয়সায়, যা আগের দিনের তুলনায় ২ টাকা ৩০ পয়সা বা ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এদিন কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বনিম্ন দর ছিল ৩৯ টাকা ৫০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ দর ছিল ৪২ টাকা ৭০ পয়সা। গত ৫২ সপ্তাহে শেয়ারটির দর ৯ টাকা ৬০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৪২ টাকা ৭০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করেছে।
লেনদেনের শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ছিল ৩৯ টাকা ৫০ পয়সা, যা আগের দিনের সমাপনী দর ৩৯ টাকা ৩০ পয়সার কাছাকাছি। দিন শেষে শেয়ারটির সমাপনী দর দাঁড়ায় ৪১ টাকা ৬০ পয়সায়।
এদিন কোম্পানিটির মোট লেনদেন হয়েছে ২৮ লাখ ১৬ হাজার ৮৯২টি শেয়ার, যার বাজারমূল্য প্রায় ১১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মোট ২ হাজার ২৫টি লেনদেনের মাধ্যমে এই শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
ডমিনেজ স্টিলের বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ফ্রি-ফ্লোট মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন প্রায় ২ হাজার ৮১৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
২০২০ সালে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের সময় ডমিনেজ স্টিলের আইপিও অনুমোদন দেন। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হয়। আইপিওর মাধ্যমে এটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এজন্য আইপিওতে তিন কোটি শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানিটি।
বিএসইসির অনুমোদনের সময়ই দুর্বল মানের কোম্পানিটির অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু ওই সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা শীর্ষ পর্যায়ের সমর্থন থাকায় এটির আইপিও অনুমোদনে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ইস্যু ম্যানেজারকে। কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে আনতে ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট। শাহজালাল ইক্যুইটির মালিকানায় রয়েছেন ছাগলকাণ্ডে আলোচিত এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান বর্তমানে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ। চক্রটি ছিল বিএসইসির সাবেক দুই চেয়ারম্যান এম খাইরুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের ঘনিষ্ঠ। এ কারণে শাহজালাল ইক্যুইটির হাত ধরে নিম্নমানের অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায় গত দুই কমিশনের সময়কালে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বছর না ঘুরতেই এটি ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত হয়। আর ভালো মুনাফা দেখিয়ে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানিটি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠান। আর এই উৎপাদন বন্ধের ক্ষেত্রেও আইন মানেনি কোম্পানিটি। ফলে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এবং কোম্পানি সচিবকে একাধিকবার কল করলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর দেশের পুঁজিবাজারে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৭৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ। এর ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৫ দশমিক ৯৭, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ১৭ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post